সারমেয় সংবাদ

ভোটের বাদ্যি শেষ!  এবার কোন বাদ্যি বেজে উঠবে জানা নেই।  নিউজ চ্যানেলের কাজের বেজায় সমস্যা।  কি করা যায় ভেবে ওঠার সময় হয় না অথচ ভাবতে হবে।  আচ্ছা আপনারাই বলুনতো নিউজ না থাকলে জোর করে নিউজ তৈরি কি করা যায়?  আমার এডিটর মশাইএর আব্দার দেখুন সবসময় করছেন নিউজ আনুন, নিউজ। চ্যানেলকে চলতে হবে তো।

এইতো সেদিন খবরে দেখালাম লীলাদি কুকুর পুষেছেন।  বিখ্যাত নায়িকার সারমেয় প্রেমের সংবাদ চ্যানেলে না দেখালে কোথায় দেখায় আপনারাই বলুনতো!  এসব খবরে এডিটরও খুশ, ফিনান্সারও খুশ! যতই হোক আড়ালে-আবডালে একটু মেলামেশাতো করা যাবে।

আমি মনে ভাবি আহা সারমেয় যদিবা হতাম!  অন্তত এডিটরের মুখ ঝামটা খেতে হতো না।  লীলা দেবী সারমেয়র লেজ ধরে আদর করেন আর আমি স্বপ্নে বিভোর হই অনৈতিক ব্যাভিচারের।  কি করি ঘরের বৌ যে ঘরেই সুন্দর।  বিছানায় পাল্টে-উলটে কি আর কল্পনা করা যায়!

কি গো কি হলো?  অফিস থেকে ফেরার সময় মুড়ির প্যাকেট আনতে পার নি?  গিন্নির আওয়াজে টনক নড়ে। মাথা নিচু করে পাজামার ফিতেই গাঁট বেঁধে ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে দৌড় দিই।  মুড়ি না এনে স্বপ্ন দেখা।

 বাড়ি ফিরে বসার উপায় নেই।  ছেলের আবদার শুরু, বাপি স্কুলের সামার ক্রিকেট ক্যাম্প-এর টাকার তদ্বির।

কত?

পাঁচ, বেশি নয়।

এমন ভাবে বলে যেন পাঁচ টাকা চাইছে, পাঁচ হাজার নয়।

আচ্ছা কাল নিয়ে নিস বলে উদ্ধার পেলাম কিন্তু জানিনা কি করে হবে? কোথ্বেকে হবে?  বধ করতে হবে কোনোও মুরগিকে।  মনে পড়ে যায় বেশকিছুদিন ধরেই পাড়ার হরিশদার কামুক দৃষ্টির ঘেঁষাঘেঁষি শুরু হয়েছে।  উদ্দেশ্য কিছুই না লীলাদির সাথে মিট করিয়ে দেবার আব্দার।  এই হয়েছে বেশ ভাল পাড়ার সকলে জেনেছে চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান, লীলাদির লীলার সঙ্গী!  পাড়ার হরিশদা রোলিং মিলের মালিক, সাদা কড়কি দেওয়া পাজামা-পাঞ্জাবী পরে ঘুরে বেড়ান, যেন সব সততা সাদাতেই রয়েছে।  বৌদির বয়স হয়েছে তাই বাইরে ছোঁকছোঁক।  এইতো সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাসের জন্য দাড়িয়ে।  ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষে দাঁড়ায় দুধ-সাদা ইনোভা।  জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলেন,
রথীন উঠে আয় দরকার আছে।

পাড়াতুতো দাদা।  না বলা যায় না।  তার ওপর দাদার দাদাগিরিও আছে।  কে জানে কখন বিরক্ত হয়ে পড়েন।

কিরে কি খবর?  একলা সব খেলে হয় নাকি?  সবাইকে দিয়ে থুয়ে খেতে হয়।  কি বল পটলা?  বলেন হরিশদা।

পটলার সায় না দেওয়ার উপায় কি।  তার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে সায় না দেয়।  রাতের পাঁইটের খরচা আছে না।  তারপর দরকারে অদরকারে চাল-কলা-বেগুন-মুলো আছে না।  লোকে বাড়ির পোষা কুকুরের যত্নেই কত কি করে তা পটলাতো মানুষ!

কাঁধে হাত দিয়ে হরিশদা বলেন, " কি হলো কিছু কি এগোলো?  আমার প্রোপোজালটা নিয়ে কি কিছু ভাবলি?  সবই তো তোর ওপরে - লীলাদির ইন্টারভিউ, পাশে আমি ও তার কুকুর।
কিন্তু কি বলি দিদিভাইকে।  উনার তো এত সময় নেই।  একটু বারফাট্টাই নেবার ভঙ্গিতে বলি। দিদিভাই!  যেন কতই না আদরের, আহা দিদিভাই চালভাজা খাই!

সত্যি বলছি তোকে আমি একটা স্ট্রিট ডগ শো অর্গানাইজ করছি।  আচ্ছা তুই বল ওদের কত কষ্ট।  তোর দিদিভাই দয়ার শরীর তাই সকলের সাথে শেয়ার করে নেন।
  
রথীনের বুঝতে বাকি থাকে না এ শেয়ারের মানেটা কি।

কইগো গিলবে এস।  সারাদিনতো চ্যানেলে মোচ্ছব চালিয়ে এলে এবার বাড়ির ভাত কি মুখে রুচবে? বৌ-এর চিৎকারে ভাঁটা পড়ে চিন্তার ক্ষেত্রে। যদিও রথীনের খাবার মাথায় উঠেছে।  প্ল্যান ভাঁজছে কাল কি ভাবে বধ করা যায় হরিশদাকে।

সাতসকালে হরিশদার দরবারে হাজির রথীন।  পটলা বাদেও জনাকয়েকের ভিড়।  সকলেই কোনোও না কোনোও তদ্বির করতে ব্যাস্ত।  তাকে দেখেই হরিশদার টনক নড়ে।  পাশে বসা বয়স্ক পাল-দাকে সরিয়ে তাকে বসান।

আলতো স্বরে বলেন, " কি রে দিদিভাই-এর সাথে কথা হলো? "

আমি ফিসফিসিয়ে বলি ঐ জন্যেই তো আসা।  লীলাদির ডেট খালি নেই।  আমি তখন আপনার কথা বললাম।  আপনার রোলিং মিলের ও নানান ব্যাবসার কথাও।  কিন্তু জানেনই তো দিদিভাই ভীষণ প্রফেশনাল।  আসলে আর কিছু নয় কিছু টাকা খেঁচার তাল।

কত?

তা দাও এখন বিশ-তিরিশ।

কিন্তু তুই প্ল্যানটা করেছিসতো।

হ্যাঁ দাদা সব পাক্কা।  আমাদের পার্কে কম্পিটিশান।  তারপর তোমার বাগানবাড়িতেই দিদিভাই-এর খাওয়ার ব্যাবস্থা।  তারপর....

ব্যাস ব্যাস... আর বলতে হবে না।  চকচক করে ওঠে হরিশদার মুখচোখ।  শালা কামুক!
বাড়ি ফিরে ফোনে ধরে তারকদাকে।  লীলাদির মেক-আপ ম্যান কাম সেক্রেটারি।  তার সাথে ভালই দহরম-মহরম।  সেখানেও একটা ছোট্ট গল্প রয়েছে।  আমাদের এক অ্যাঙ্করের সাথে তার ফষ্টিনষ্টি করার ব্যাবস্থা করে দিতে হয়েছিল একসময়। তারপর আর কি।  মাস ছয়েক বাদে ডাক্তারবাবুর চেম্বারে!  এখন শুধু ফোনে তারকদাকে ধরলেই হলো- অগতির গতি।

বিকেলের দিকে তারকদার ফোন, চলে আয় কনভেন্ট পার্কের ফ্ল্যাটে।

অগত্যা।  যদিও মনে লাড্ডু ফুটেই চলেছে।  একটু সৌন্দর্যের ছোঁয়া, সুন্দর গন্ধযুক্ত পরিবেশ, সবমিলিয়ে টাটকা-তাজা চনমনে ভাব চলে আসে শরীর-মনে দিদিভাই-এর সান্নিধ্যে এলেই।

সোফায় বেশ খানিক অপেক্ষা করিয়ে দিদিভাই এলেন হেলিয়ে দুলিয়ে।  আমিও হেলি-দুলি দিদিভাই-এর তালেতালে।  মিষ্টি মাপা হাসিতে দিদিভাই-এর যৌবন চলকে চলকে পড়ে আর তারই ধারে-ভারে আমরা মানে টিভি চ্যানেল টি আর পি খুঁজি।  সময় নষ্ট না করে সোজা কথায় আসা আমার স্বভাব।

দিদিভাই, আমার এক পাড়াতুতো দাদা মানে বেশ প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে উনার, আপনাকে একবেলার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

মানে!

না মানে, আমাদের পাড়ার হরিশদা বলছিলেন দিদিরতো খুব কুকুর ভাললাগে তাই উনি যদি একটা স্ট্রিট-ডগ শো অর্গানাইজ করেন ও আপনি তাতে হাজির থাকেন।  উনি ভীষণ কুকুরপ্রেমী।  ভোরবেলা রাস্তার কুকুরকে বিস্কুট খাওয়ান।  তিনি মাঠে হাজির হলেই সব দলবেঁধে হাজির হয় উনার কাছে।  সকলে বলে হরিশদার দরবার।  অবশ্য মানুষও থাকে সেখানে।

হাউ সুইট!  আহা রে।  আমারও না ভীষণ ইচ্ছে করে রাস্তার কুকুরকে বিস্কুট খাওয়াতে।  কিন্তু আমরা সেলিব্রিটি, রাস্তায় হাঁটার উপায় আছে!

তা যা বলেছেন দিদিভাই।  খাওয়াবেন সেদিন যত ইচ্ছে।

আমায় কতক্ষন থাকতে হবে?  পা-এর ওপর পা তুলে লীলাদি বসেন।

বেশি না।  ডগ শো আর তারপর দাদার বাগান বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া।

দেখ ভাই, আমি কিন্তু ভীষণ প্রফেশনাল এসব ব্যাপারে।  টাকা-পয়সা বুঝে নিই।

আহা, আপনি চিন্তা করেন কেন, আমি চ্যানেলের ব্যাপারটা করে দিই নি।  এই যে আপনি স্ট্রিট-ডগ শো করবেন, আমার চ্যানেলের এক্স্ক্লুসিভ কভারেজ হবে, তাতে আপনার ইমেজ বাড়বে না।

মিথ্যেই গড়গড়িয়ে বলে দিই চ্যানেল এডিটরের সাথে কথা হয়ে গেছে। সব ফাইনাল।  আপনি শুধু ডেটটা দিলেই সব রেডি করে ফেলি।  আরোও আগ বাড়িয়ে বলি, হরিশদা ও আমার এডিটরতো অপেক্ষায় অধীর হয়ে রয়েছেন।

" তবুও আমার সময়ের দাম আছে না।  ঐ গরমে রাস্তায় দাড়িয়ে আমার স্কিন-ট্যান নষ্ট হবে না। "   দিদিভাই এবার উঠে আমার পাশে বসেন, " ভাইটি চ্যানেল এডিটরকে বল না একটা এক্স্ক্লুসিভ ইন্টারভিউ অ্যারেঞ্জ করতে, শুধু এডিটর আর আমি।"

সে তো বেশ ভাল কথা, ঐ বাগানবাড়িতেই সেদিন ইন্টারভিউটা হয়ে যাক।  কোনোও স্পেশাল হোস্ট চাই?

দাঁতে দাঁত চিপে, ভুরু কুঁচকে উত্তর দেন নায়িকা, একটু ইন্টেলেকচুয়্যাল না হলে ঠিক আমায় বুঝতে পারবে না।

তবুও, কোনোও স্পেশিফিক মানুষ?

না...আ..... আমি ঔ তাঁবেদারিতে নেই।  ডান-বাম আমার কাছে সব সমান।  কেন তোমাদের হরিশদাকে বললেইতো পার, উনিই তো বেশ ভাল, কুকুরদের যত্ন-আত্তি করেন দয়ার শরীর।

সেদিন রাতেই প্রায় দৌড়তে-দৌড়তে হরিশদার বাড়িতে পা রাখি।  যতইহোক বিশ হাজার রোজগার হয়েছে সকাল থেকে তারকদার খরচা বাদে।

আয় রথী আয়।

বাব্বা শর্টফর্মে ডাকা শুরু হয়ে গেছে একদিনে।  আমি স্মার্টলি বলি, দিদিভাই মানে লীলাদির সাথে কথা হয়ে গেছে।  উনি রাজি।  আপনাকে ডেট জানিয়ে দেবেন।  সব রেডি করা শুরু করুন।  আর বাগানবাড়িতে আপনি উনার সাথে লাঞ্চ-টাঞ্চ করছেন।  ঠিক আছে?

লাঞ্চ নাহয় বুঝলাম, কিন্তু হরিশদা টাঞ্চ-এর কি মানে করলেন জানি না।  যাইহোক আমি খুশি আমার তানে বাকি চুলোয়া যাক!  এই বেশ ভাল আছি গান গাইতে গাইতে বাড়িতে পা রাখি আর বৌ-এর চিৎকার-- কি গো খুব ন্যাবা জেগেছে?  এই বেশ ভাল আছি আর আমি গরমে মরছি!

আমি সুর করে বলি, রহ ধৈর্যং ডার্লিং... কালই এসি লেগে যাবে।

বৌ তাকায় তির্যক দৃষ্টিতে।  কাছে এসে গা-ঘেঁষে বলে কি ব্যাপার বল তো?  লটারি লেগেছে নাকি?  দেখো আবার কোনোও উল্টোপাল্টা করছ না তো?  যা সব তোমাদের চ্যানেলের কান্ড খবরে ছাপছে ভয়ই লাগে।  তোমাদের মালিকের আবার কোনোও কেস নেই তো?

সে যাই হোক গরমের বাজারে এসি লেগেছে ঘরে, বৌ-এর যত্ন-আত্তিও বেড়েছে।  সবই হরিশদা ও লীলাদির কল্যানে।  মাঝে শুধু চ্যানেল!

ভোরবেলা তাড়াতাড়ি বৌ ঘুম থেকে তুলে দেয়।  অর্গানাইজার বলে কথা!  হরিশদার চামচেরা এখন রাস্তায় দেখা হলে সম্মানের সাথে কথা বলে।  পাটভাঙা জিন্স ও টি-শার্ট পরে রথীন খোঁচড় চলে শো অর্গানাইজ করতে।  জগৎ জানে ক্যামেরাম্যান, আমি জানি আমি কি গুরু!

পাড়ার মাঠে দেখে গিলে করা পাঞ্জাবী ও পাজামাতে হরিশদা বাজিমাত করার চেষ্টায়।  সাথে সব পাড়ার গুনীজন!  আছেন বৌদিও।  সারি দিয়ে নেড়ি কুকুরের দল দাড়িয়ে মাঠের ধারে, সাথে এক ট্রেণারও আছেন। সবই হরিশদার কেরামতি।  কোনোও ফাঁকই রাখতে চান না।

আমি পৌঁছতেই গরম কফি পৌঁছে গেল।  হরিশদা বেশ গম্ভীর স্বরে বলেন কি বলিস সব ঠিক আছে? 

তা আর বলতে।  আপনার ব্যাবস্থা বলে কথা।

হুঃ হুঃ।  বৌদিও খুব খুশি।  আসলে এটাতো ওরই প্ল্যান।  প্রায়ই রাতে আমার কাছে গুমরোতো সবইতো হলো সম্মান এল না।

আমিও তো জানিস এক রকবাজ।  ভাঁজলাম এই প্ল্যান।  তার ওপর তোকে পেলাম লীলাদিকে বাগানোর জন্য।  একঢিলে দুই পাখী মারা যাবে।

মানে!  আমি একটু না বোঝার ভান করেই বলি। 

পিঠে হাত রেখে গা'য় হাত বুলিয়ে হরিশদা বলেন, সবইতো বুঝিস ভাই।

শালা হারামি মনে আসে, কিন্তু বলি কি করে।  উনার সাধ্য আছে আমার সাধ্যি নেই এইতো তফাৎ।

সবই ঠিক ছিল তারকদার ফোন না আসা পর্যন্ত।  লীলাদির শরীর খারাপ!  মাথায় বাজ। 

মানে!  কিন্তু আমি কি করব তারকদা?

কেন?  অসুবিধের কি আছে?

এখন দিদি কোথায় পাই?   হরিশদার ছেলেরা মেরে পুঁতে দেবে।  তুমি দিদিভাইকে বল যেভাবে হোক আসতে। 

ফিসফিসিয়ে বলে তারকদা সত্যি বলি দিদিভাই কাল রাতে ছুটি কাটাতে গেছেন।  বাকি আর কিছু প্রশ্ন করিস না।  আমায় রাতেই বলেছেন রথীকে বলিস তুলিকে ফোন করে নিতে, সব বলা আছে।

যাহঃ কেলোর কেত্তন।  তুলিদি!! 

তাতে কি হয়েছে?  দিদিই তো?  না পারিস তো আমি ফোন করে দিচ্ছি।  ওরে বোকা, হরিশদার দিদির প্রোয়োজন, লীলাদিকে নয়।

কাকে তুমি সাজেস্ট কর?  

কেন তুলিদিকেই বল না।  দিদিভাইতো বলেই রেখেছেন।  ওর বাজারতো ভালই যাচ্ছে।  টেলিগুলোতে জমিয়ে দিয়েছে।  এইতো সেদিন ফিতে কাটতে গেছল।  ওরে বোকা দাদা-দিদি সকলেই যায়! 
 
পরদিন আমার চ্যানেল নিউজে তুলিদির সারমেয় প্রেমের খবর দিয়েছিল, সাথে হরিশদা!  পাড়ায় বাজার গরম - অবশ্য আমারও।  

















Comments

Popular Posts