ক্রিয়েটিভ স্কিলটা চাই

 অনেক সময় অনেক কিছু বলার ইচ্ছে থাকলেও বলা হয়ে ওঠে না।  বেশ কিছুদিন আগে এক সকালে এক বয়স্ক মানুষ দরজার কড়া নেড়েছিল, কড়া নাড়া বলতে আজকের যুগে কলিং বেল বাজানো আর কি।  দরজা খুলে একটু অবাক হতেই ইশারায় পাশ থেকে স্ত্রী বলে ইনিই সেই ভদ্রলোক যাঁর কথা গতকাল রাত্তিরে বলেছিলাম।  অগত্যা!  ঘরে ঢুকিয়ে বসিয়ে একের পর এক কথা শুনি।  বহুদিনের পুরোনো এক কার্ড হাতে ধরিয়ে ভদ্রলোক নিজেকে ইন্ট্রোডিউস করালেন।  

কার্ডটা উল্টে-পাল্টে দেখি নানান সঙ্গীতের ডিগ্রিধারী ও নানান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ানোর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষ।  ভিতরে এক সম্ভ্রম জাগলেও আমরা সাধারন মানুষেরা সব কিছুই কৌতুহল ও সন্দেহের সাথে গ্রহণ করি।  ভদ্রলোকের চেহারা ইম্প্রেসিভ না হওয়ায় সাধারন কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই ও আমরা স্বামী-স্ত্রী ভদ্রতাবশত এক কাপ চা অফার করি।  

ভদ্রলোক বিদেয় নিলে স্ত্রী স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত সুলভ চাপাস্বরে বলে - কি চাইছিলেন ভদ্রলোক? 
- না তেমন কিছু না। 
- তবুও? 
- সিনেমা বানাতে চান ভদ্রলোক। আগে শর্টফিল্ম বানিয়েছেন।  তাই কোনোও নামকরা ডিরেক্টরের সাথে থেকে কাজ শিখতে চান। 
- কিন্তু তুমি তো ডিরেক্টর নও।
- সেটাই তো ভদ্রলোককে এতক্ষন ধরে বুঝোচ্ছিলাম।  সেই কোন সুদূর ছত্তিসগড় থেকে এই বয়সে এখানে এসে কার না কার কাছে থাকছেন তার ঠিক নেই।  বয়স হয়েছে প্রায় ষাটের ওপর।  একবার বলছেন আগে এখানে থাকতাম।  এখানে ফ্ল্যাট ছিল ভাইয়েরা কেড়ে নিয়েছে, কখনওবা বলছেন এক বিশেষ জরুরি কারনে ছত্তিসগড়ে চলে বাধ্য হয়ে ছিলেন।  পাগল বোধ হলো।  
- তা তুমি কিছু বললে না। 
- কি বলি বল তো? আমি আবার পরে আসতে বলেছি।
- তুমি আবার আসতে বলেছ? স্ত্রীর গলার স্বরে একটু পারদচড়া ভাব। 
- তা কি করি বল। তুমিই তো প্রথমে ডেকেছ। 
- আমি কি বলেছি।  কারোও কাছ থেকে খবর পেয়ে তোমার সাথে যোগাযোগ করতে চান। আমি শুধু বলেছি সকালে আসুন দেখা হবে। 
বেশ রাগ নিয়ে স্ত্রী ঘর পরিবর্তন করেন।  বুঝলাম সব আমার দোষ।

সেদিন বিকেলে আবার মেসেজ এল ফোনে।  যদিও ফোন নাম্বার শেয়ার করা স্বভাববিরুদ্ধ তাও ভদ্রলোককে দেখে কিছু একটা হয়েছিল তাই দিয়েছিলাম না বলে বলা ভাল বাধ্য হয়েছিলাম।  মেসেজটা নিমন্ত্রনের তার শর্ট ফিল্ম দেখার জন্য কোনোও এক বিশেষ ফেস্টিভ্যালে।  যথারীতি অফিস-কাজ-ব্যাস্ততার দোহায় দিয়ে আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি।  

দিন কয়েক পেরিয়েছে।  সময়ের নিয়মেই স্ত্রীর গোঁসা পড়েছে ও আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক।  এক রাতে রুমিয়া মানে আমার স্ত্রী’র প্রশ্ন জাগে ভদ্রলোকের কি হলো? 
বিরক্ত আমি জবাব দেবার চেষ্টা করেও থেমে যায়।  সত্যিইতো ভদ্রলোক আর যোগাযোগ করেন নি।  
স্ত্রী জবাব দেয় - করেছিল।  আমার সাথে।  
- মানে!!! 
- একটা ডিভিডি দিয়ে গেছেন ভদ্রলোক আজ।  বলেছেন দুজনে একসাথে বসে দেখতে।  ভাল লাগলে ফোন করতে।  
- তুমি দেখেছ? বিষ্ময়ভরা গলায় আমি জিজ্ঞেস করি। 
- না এখন দেখব….. বলে ল্যাপটপটা টেনে নেয় পাশে। 
দুজনে বসে দেখি রাতজেগে, একবার নয় বারবার….।

কি দেখেছিলাম আর বলতে পারি না শুধু এটুকু বলি আজকের ডিজিটাল এজ-এ 16 মিমি’র সিনেমা’র চেয়ে ভাল আউটপুট ঘরে থাকা যেকোনোও ডিজিটাল ক্যামেরাতেও যে দেওয়া যায় ভদ্রলোককে ভাগ্যিস বলতে যায় নি - অপাত্রে দান হতো কারন ভদ্রোলোক সব জেনেই শর্ট ফিল্মটা বানিয়েছিলেন।  আপনাদের যদি কারও কখনও কোনোও সিনেমা বানানোর ইচ্ছে জাগে প্রতন্ত্য গ্রামে বসে সাধারন মাপের ডিজিটাল ক্যামেরায় ট্রাই করতে পারেন।  অসম্ভব নয়!!!  শুধু বানানোর ক্রিয়েটিভ স্কিলটা চাই। 

ভদ্রলোককে ফোন আর করা হয় নি।  লজ্জায়।  নিজের বিজ্ঞভাবের বদান্যতায়।  যে জেনে বসে আছে তাকে কি জ্ঞান দেওয়া যায়?    

Popular Posts