প্রফেসর ক্যালকুলাস..

ঝিরঝির করে বৃষ্টিটা এক নাগাড়ে পড়ে চলেছে, তার সাথে বাজ পড়ার আওয়াজ। মাঝে মাঝে কেঁপে উঠতে হয়। জানালার বাইরে তাকিয়ে বিরক্তিটাই বাড়ে। বেরোতে হবেই, কিন্তু মাঝের ঐ উঁচু-নিচু জলকাদা ঘেরা জায়গাটার কথা ভাবলেই গায়ে জ্বর আসে। বাড়িতেও কেউ নেই। তিন্নির বাড়িতে না গেলেও চলবে না। এতকিছু ভাবতে ভাবতে বাড়ির বাইরে পা রাখে সুহাস।
গেটটা খুলে বেরিয়ে একটু এগিয়ে থমকে দাড়ায়, জলকাদায় মাখামাখি জায়গাটা। খানিক অপেক্ষা করে প্যান্টটা তুলে পেরোতে গেল আর একটা কালো গাড়ি সর্বনাশটা করল পেরিয়ে।
ঈশ্, জামাটা গেল। আবার বাড়ি ফেরো। ঠিক করে ফোন করে প্রোগ্রামটা ক্যানসেলই করে দেবে। পাশ থেকে মিউ মিউ ডাকটা শুনে সুহাস ঘুরে দেখে বেড়ালবাচ্চাটা ফেন্সিংটার গায় বৃষ্টির ঝাঁট থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। কি মনে করে সুহাস বাচ্চাটাকে কোলে তুলে বাড়ির ভেতর পা বাড়ায়। বাচ্চাটা পরম আনন্দে কোলে শরীর গুঁজে পিটপিট করে তাকাচ্ছে। এটা পরিস্কার কোলটা ওর কাছে আরামদায়ক হয়েছে। বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে নিশ্চিন্তি।
ঠান্ডা মাথায় এবার কাজগুলো সারতে হবে ভাবে সুহাস। বেড়ালবাচ্চাটাকে নামিয়ে ফোনের দিকে হাত বাড়ায় - ডায়ালটোন নেই। বিড়বিড় করে কার মুখ দেখে যে উঠেছিলাম। মোবাইলও নেই ছাই, বাপিকে অনেকদিন থেকেই বলছে কিন্তু শুনলে তো। অগত্যা মা’র মোবাইল লুকিয়ে চুরিয়ে ব্যাবহার করা। আজ মা নেই, বদ্দি’র বাড়ি গেছে। কি যে এত মাসির বাড়ি যাবার আনন্দ। ওর তো একদমই ভাল লাগে না। আজকের প্ল্যান ছিল কাকিমা রান্না করে রাখবেন আর তিন্নির সাথে জয়েন্ট স্টাডি। সব গুবলেট হয়ে গেল।
মিঁউ মিঁউ শব্দে হুঁস ফেরে সুহাসের। বেড়ালবাচ্চা ডাইনিং টেবিলের তলায়, কার্পেটে কাদার দাগে ভর্ত্তি। মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। নিজের শার্ট-এর দিকে তাকিয়ে চক্ষু চড়কগাছ!!! মাটি-কাদার দাগে ভরে গেছে পুরো শার্টটা। বেড়ালবাচ্চার ঘাড় ধরে বাথরুমে, নিজের প্যান্ট-জামা ছেড়ে টাওয়েলটা জড়ায়। কল খুলতেই খেলা শুরু, শান্ত বেড়াল অশান্ত হলে কি হতে পারে সুহাস টের পেল - চরকির পাক খাইয়ে সুহাসকে মেঝেতে চিৎ পটাং! টাওয়েল খুলে, বালতি ছিটকে একাকার।
সবশেষে সুহাস যখন যুদ্ধ জয় করে বেরোলো বেড়াল লাল কার্পেটের ওপর বসে জল ঝাড়ছে, শুরু হয়েছে জিভ বার করে শরীর চাটা। সুহাস পুরোনো একটা গেঞ্জি এনে মুছিয়ে দেয়। ভাল করে দেখে কালোর ওপর সাদার ছিটছিটে দাগ রয়েছে বেড়াল বাচ্চাটির। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করে-
কি রে তোর কি নাম রাখি? উঠে যায় গ্যাস ওভেন-এর দিকে। দুধ গরম করতে দেয় সুহাস। কাল রাতের কয়েকটা পাঁউরুটি বেঁচে রয়েছে। ফ্রিজটা খুলে বার করে কয়েক পিস। একবার উঁকি মারে কিচেনের দরজার ফাঁক দিয়ে- কোন খেয়ালে ডাক পাড়ে “ ঘন্টিইইই……।”
মিঁউ মিঁউ ডাক পেড়ে সাড়া দেয় ঘন্টিইই..
সুহাস ফের সুর করে ডাক পাড়ে - ঘন্টিইইইইইই……..।
ঘন্টিইইই প্রত্যুত্তর দেয় - মিঁউ মিঁউ মিঁউ ….। পা বাড়ায় কিচেনের দিকে। সুহাসের মনে হয় নামটা পছন্দ হয়েছে বেড়াল-বাচ্চাটির। আনন্দে দুই পাক দিয়ে নেয় সে। হুঁস ফেরে দুধ পোড়ার গন্ধে। এক লাফে গ্যাসটা অফ্ফ করে।
ঘন্টাখানেক পরের দৃশ্য এই - বড় কাপড় বিছানো ড্রয়িং রুমে, তারওপর বসে ঘন্টিইইই মহাআনন্দে দুধ-পাঁউরুটি খাচ্ছেন। ভেতরের ঘর থেকে ড্রেস চেঞ্জ করে আসে সুহাস। চেয়ার টেনে বসে শুরু হয় পর্যবেক্ষন - কখনও বাটি ঘোরে তো কখনও ঘন্টি। দুষ্টুমি করে ডাক পাড়ে ঘন্টিইইই..। খাওয়া থামিয়ে ঘন্টি মুখটা তোলে, মুখে বিরক্তির ছাপ। জিভ বার করে গাল চেটে আবার শুরু হয় দুগ্ধ প্রেম! বাজ পড়ার আওয়াজে ঘন্টি কেঁপে ওঠে, বন্ধ হয় খাওয়া। গা ঘেঁষে বসে সুহাসের। বৃষ্টির ঝাঁট বাড়ছে দেখে জানালা বন্ধ করতে গিয়ে মনে পড়ে তিন্নির কথা - আজ জয়েন্ট স্টাডি ছিল। সোমবার ম্যাথস টেস্ট। তিন্নির ক্যালকুলাসের ফান্ডাটা বেশ ভাল। তার নিজের তো ক্যালকুলাস শুনলে প্রফেসর ক্যালকুলাস-এর ছবি ভেসে আসে। কিছুতেই মাথায় ঢুকতে চায় না। জানালাটা টানতে গিয়ে একটা বড় লাইটনিং। ব্যাস!! পাওয়ার অফ্ফ। পুরো বাড়ি অন্ধকার। ইন্ভার্টারটাও খারাপ হয়েছে। ঘন্টি মিঁউ মিঁউ করে ওঠে। কোনোও উপায় নেই। জানালাটা আবার পুরোটা খুলতে হবে তাহলে অন্তত কিছুটা আলোর ছটা আসবে। তারপর ক্যান্ডেল-দেশলাই খোঁজার পালা। বাইরে উঁকি মারতে গিয়ে অবাক হয় - ফর্সা করে এক কুঁচকানো চামড়ার বৃদ্ধ বাড়ির দরজার গায় শেডটার নিচে দাড়িয়ে, হাতে এক বড় ছাতা প্যান্টটা প্রায় থ্রি-কোয়ার্টার গুটোনো। সুহাস বোঝে বৃষ্টির জোর ছাতার ক্ষমতার চেয়ে বেশি। একবার মনে হয় ভেতরে ডেকে নেয় আবার মা’র সাবধানবানী মনে পড়ে। “ বাবান, অচেনা কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেবে না। দিনকাল খারাপ। “
শেষপর্যন্ত মা’র সাবধানবানীর ভয় জয় করে বুড়োকে ভেতরে ডেকে নেয় সুহাস। কিচেন থেকে ক্যান্ডেল জ্বেলে টি-টেবিলের ওপর রাখে। বুড়ো তখনও দরজার কাছে দাড়িয়ে। সুহাস ভেতর থেকে একটা গামছা এনে দেয়। হাত-পা মুছে বুড়ো নিজেই ভেতরে এসে বসে। ঘন্টিইই যথারীতি সোফায় গা এলিয়েছেন। সুহাস ঠিক বুঝতে পারে না বুড়োকে ঠিক কি বলে সম্বোধন করে। বুড়ো মনের কথা টের পেয়ে ভাঙা বাংলায় বলে ওঠে, “ কি ভাবছ কি বলে ডাকবে? আপনি না তুমি? “
সুহাস চমকে ওঠে ওর মন পড়ার ধরনে। বুড়ো আবার বলে, “ আমায় তুমি কুমোর বুড়ো বলতে পার।”
শুরু হয় বুড়োর কথার মালা। তার ছেলেবেলার গল্প। বড় বেলার গল্প।
সেই কোন ছোট্ট বয়সে বুড়ো পালিয়েছিল বাড়ি থেকে। এধার-সেধার ঘুরে খেয়ে না খেয়ে কাটিয়ে বিনি পয়সার ট্রেণ-এ বাসে চেপে বুড়ো শেষপর্যন্ত এসে পড়ে নদীর ধারে এক কুমোরের কাছে। কুমোর তাকে নিজের ছেলে ভেবেই মানুষ করে। হাতে ধরে মাটির প্রদীপ, খুরি, ভাঁড় সবকিছুই বানাতে শেখায়। বর্ষা পেরোলেই ছিল আনন্দের দিন। সমস্ত পূজোর সময়। দেওয়ালির সময় ভারি ভালো লাগত প্রচুর কাজ প্রচুর অর্ডার প্রচুর রকমারি প্রদীপ। বুড়োকে সে ডাকত বড় বাবা। সেও ছিল একলা। বয়সকালে দায়িত্ব ছাড়তে শুরু করে বড়বাবা। বড়বাবা গেলে কুমোর বুড়ো মজে থাকত রকমারি প্রদীপের ছাঁচে। ভীষণ আনন্দ পেত সারি সারি প্রদীপের আলোর মেলায়।
উৎসাহ নিয়ে কুমোর বুড়ো বলে, “ তুমি যাবে আমার সাথে প্রদীপ বাননো শিখতে? “
টিভির শব্দে ঘোর কাটে সুহাসের। বৃষ্টি ধরে এসেছে। আলো জ্বলছে - ঘন্টিও নেই বুড়োও নেই তিন্নিও নেই। নিজেকে একটা চিমটি কেটে দুখি সুহাস ফের মন বসায় ক্যালকুলাসে।
পরদিন তিন্নিকে বলেছিল পুরো ব্যাপারটা। তিন্নি তার বেষ্ট ফ্রেন্ড। সব শুনে সে বলে “ মুঙ্গেরিলাল কি হাসিন্ স্বপ্নে দেখেছিস?” বাড়ি ফেরতা পথে তিন্নি বলে, “ বাবান তুই গল্প লেখ ক্যালকুলাস শিখে তোর কাজ নেই।”
Post a Comment

Popular Posts