হায় ধরীত্রি !!

আমি রুপে তোমায় ভোলাবো না.... গানটা দূরে কোনোও এক বাড়িতে বেজেই চলেছে। কার মনের কি অবস্থা বোঝা দায়। অন্তত জিয়াতো বুঝতেই পারে না।  তার ওপর নিজের মনের অবস্থা! সে তো এক বিতিকিচ্ছিরি। কোথ্বেকে এত রাগ পেল তা সে নিজেই জানে না।  বহুবার চেষ্টা করেছে নিজেকে বলার - কন্ট্রোল! কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। এখন তো এমন এক অবস্থা যে সে নিজেই নিজেকে রিকোয়েস্ট করে রাগ করিস না রে মন। এই গানটা তার রাগ আরোও বাড়িয়ে দেয়। উস্কে দেয় এক পুরোনো স্মৃতি। সে ছিল এক দূরের দেশ, কল্পনার দেশ, ইংরেজিতে যাকে বলে ডে-ড্রিমারদের দেশ অর্থে দিবাস্বপ্ন দেখার দেশ।
বাড়ির পাশেই থাকত উপালিদিরা।  তাকে দেখলে জিয়ার মন ভাল হয়ে যেত; সাদা-ফর্সা-বড় চুল- মিষ্টি হাসি, গায়ের গন্ধটাও ছিল ভীষণ মিষ্টি। জিয়া তখন সবে বড় হওয়ার পালা। নিষ্পাপ ভাব থেকে পাপের পথে মনের যাবার শুরু হয় নি। যদিও এখন বোঝে পাপ-পূন্যের বেড়াজালে কতই না মুক্তো হারিয়েছে। উপালিদি কাছে টেনে আদর করত, তার শরীরের মিষ্টি গন্ধের লোভে প্রায়ই হাজির হয়ে পড়ত উপালিদির বাড়ি।  মা বলত উপালি ন্যাওটা।
উত্তরে উপালি দিদি খালি হেসে চুলগুলো ঘেঁটে দিত আর আমি লাজুক সুরে বলতাম আমি উপালিদিদির কাছেই থাকব। উপালিদিদি ভাল।
একদিন সকলের অলক্ষে দুপুরবেলা গরমের ছুটিতে উপালিদিদির বাড়ির এধার-সেধার যেয়ে দেখতে না পেয়ে ছাদে পা বাড়ায়। ছাদে মেলা কাপড়গুলো পেরিয়ে আলতো করে ওদিকে পা রাখতেই দেখি উপালিদিদি কাঁদছে। সেই আমার প্রথম কান্না দেখা বড়দের। ছোটরা কাঁদে তা স্বাভাবিক, কিন্তু বড়রা! বেশ খানিক থমকে দেখে পালিয়ে আসি গুটিগুটি পায়। বাড়িতে ফিরে মাকে বলি --
জান মা, আজ না ছাদে গিয়ে দেখি উপালিদিদি কাঁদছে।
মা কিছু না বলে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। রাত্তিরে শোবার পর মা'র শুরু হয় গল্প, তার ছোটবেলার গল্প। গ্রামের বাড়ি, মেঠো পথ আলের পথ পেরিয়ে স্কুল, বর্ষার নদীতে ঝাঁপ, রাত্তিরে অশথ্বতলার বুড়োর ভয়ে ছমছমানি পরিবেশ। মা হেসে বলত - তোর মা ভীষণ ডানপিটে ছিল, ভরা বর্ষায় নদী পেরোনোর চ্যালেঞ্জ নিত সে ছেলেদের সাথে। আর বাড়ি ফিরলে ছিল মা'র বকুনি - নীরা তুমি মেয়ে, তোমার সবকিছু সাজে না।
- কেন? কেন??? বলে দৌড় দিত বাপির কাছে।  বাপির প্রশ্রয় ছিল বলেই সে গ্রামের বাড়ি থেকে বের হতে পেরেছিল। পেরেছিল পড়াশুনো করতে বাইরে আসতে। তাদের ছিল জয়েন্ট ফ্যামিলি কিন্তু বাপি সাথে থাকায় বাড়ির বড়রা কিছু বলার সাহস পায় নি।
তারপর... জিয়ার কৌতুহলী মন বলে ওঠে।
তারপর আর কি...। কলেজের পড়া, মেয়েদের হস্টেল... ইত্যাদি। তখন মেয়েরা ছেলেদের মত এত স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগ পায় নি। তারই ফাঁকে আমার আলাপ জমে সুদীনের সাথে। লাজুক মিষ্টি ছেলে। আমার খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়েছিল।
তারপর.... ?? কৌতুহলী জিয়া স্থির থাকতে পারে না।
তারপর আর কি? বড় হলে মেয়েদের বেশিরভাগ বন্ধুত্ব ডানা মেলে উড়ে যায়।
এরপর মা চুপ করে যায়.... 
জিয়া আর কোনোও প্রশ্ন করে নি কারন সেই অন্ধকারেও জিয়া মা'র চোখে বৃষ্টিধারা।
আজ এত বছর পর জিয়া সমাজসেবী। তার একটা নিজস্ব পরিচয় তৈরি হয়েছে। সময় বদলেছে, সুযোগ বেড়েছে, সুবিধে বদলেছে, কিন্তু মানসিকতার ফারাক - উঁহু ! সূদূর অস্ত!!! 
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থায় এখনও নারীর বলার অধিকার নেই - আমি রুপে তোমায় ভোলাবো না।  বাতাসে ভাসে অক্ষর, সেই চর্বিত চর্বণঃ নারী বীরভোগ্যা।
হায় !!! ধরীত্রি বীরভোগ্যায় বা বটে।        






Popular Posts