সঞ্চার

জানার কোনোও শেষ নাই জানার চেষ্টা বৃথা তাই....

অ্যানালিটিক্যাল মানুষদের এই সমস্যা।  শুধু চুপ করে বসে থাকে।  আর যত জ্বালা নিমিতার।  বাপি-মার অমতে বিয়ে।  বয়সের ব্যাবধান ছিল বেশ, প্রায় বছর ছয়েক।  তবুও বিয়েতে কুন্ঠা বোধ করেনি নিমিতা।  বেজাতে বেধর্মে বিয়ে।  সকলে বলেছিল পরে বুঝবে।  হ্যাঁ, এখন নিমিতা হাড়ে-হাড়ে টের পাচ্ছে।  প্রব্লেম সাদাৎ কে জড়িয়ে নয়, তার বোনেরা।  বিয়ের শুরুতে বেশ ছিল সব।  ভাবী ভাবী করে মাথায় তুলে রেখেছিল।  পরে নিমিতার খোলামেলা ব্যাবহার তাদের সমাজে অসুবিধের সৃষ্টি করল।  অগত্যা সাদাৎ বাড়ি ছেড়ে এই বড় কমপ্লেক্স-এর বহুতল বাড়ির ভাড়াটে।  ছোটোবেলার খেলার সাথীরা একসাথে বড় হওয়া ও তাদের সাথে জীবন কাটানোর আনন্দ নিমিতা বুঝবে না।  সেও বোঝে নি একসময় পর্যন্ত্য কিন্তু এখন বোঝে।  সে ছিল সাদাৎ-এর বাবার সময়কার কথা, পার্টিশানের সময়, সকলে মিলে একসাথে এসে বসেছিল এই শহরে নতুন জায়গায়।  অনেক সাথী বিচ্ছেদ হওয়ার পর এইসব নতুন সাথী।  সকলের একসাথে বেড়ে ওঠা, জুম্মার নামাজ পড়া, মৌলবীসাহিবের সাথে কোরানের হাদিস পড়া।  শুধু তাই নয় মৌলবীসাহিবের ছিল পড়ার নেশা তার থেকেই পাওনা নানান ধর্মের সার কথা।  তিনি বলতেন বেটা সব পড়বি, কুঁয়ার ব্যাং হবি না।  সময়ের সাথে প্রকৃতি যখন বদলায় আমরাতো মানুষ কোন ছার, আমাদেরও বদলাতে হবে।  আর শুধু বলতেন -- বহতা হুয়া পানি নির্মল হোতা হ্যায়.....

আজ মৌলবীসাহিবের মৃত্যুর খবর পেয়েছে।  মনটা ভীষণ খারাপ।  তবুও মনে পড়ে যায় বাড়ি ছাড়ার দিনের কথা, বাপি-মা-বোনেরা সকলেই দরজা বন্ধ করে বসেছিল।  এমনকি একসাথে বড় হওয়া ছেলেবেলার সাথীরাও কথা বলেনি।  শুধু মৌলবীসাহিবের কথায় আলাদা, গায়ে হাত বুলিয়ে বলেছিল - খোদার ওপর খোদকারি করতে নেই... যা বেটা, বিবির সাথে ঠিকভাবে জীবনটা কাটা।  সময় সব ঠিক করে দেবে।

গেছিল, সাদাৎ গেছিল কবরখানায়।  শান্ত বাগানে ছেঁড়া-খোঁড়া আলোয় মাটিও দিয়ে এসেছে সে।  তাকে তো কেউ খবর দেয় নি, এমনকি বাপিও না, তাই পরদিন মাটি দিয়েছে।  বসেওছিল অনেকক্ষন।  কেঁদেছে, কথা বলেছে, চুপ থেকেছে।  ঠিক মেলাতে পারে নি সকলের ব্যাবহার।  মৌলবীসাহিবের মৃত্যু কি ধর্মের উর্দ্ধে নয়!  কি এমন ধর্মের ব্যাবধান যে মিটেও মেটেনা!  একই অবস্থা নিমিতার তরফেও।  এটাতো সে চাই নি।  নিমিতার বাড়িও তাদের সম্পর্ককে মেনে নিতে পারে নি।  জটিলতার আবর্তেই ঘুরে চলে তাদের জীবন।  পাড়ার পলিটিক্যাল দাদা পানের দোকানে দাড়িয়ে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বলেও ফেলেছে - ধর্ম ভেঙে সমাজ গড়া যায় না।  একদিন সমাজই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ভেঙে বেরিয়ে আসবে সাদাৎ সে সম্পর্কে নিশ্চিত তবুও মিষ্টি হেসে পেরিয়ে যায় পানের দোকানটা।  কি দরকার ভাবে সে।  নিমিতাকে নিয়ে একলা থাকে ফ্ল্যাটে, কখন কি হয়ে যায় বলা মুশকিল!

ঘুম ভাঙতে নিমিতা দেখে অন্ধকার।  শোবার ঘরের বাইরে পা বাড়ালে দেখে সাদাৎ বসে জানালার ধারে।  বৃষ্টির ঝাঁট এসে ভিজিয়ে গেলেও তার খেয়াল নেই।  এমনকি নিমিতার পা-এর শব্দেও চেতনা ফেরে নি।

লাইট জ্বেলে প্রশ্ন করে, " কি গো কি হলো? "  কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করে ইমোশনাল গ্রাউন্ডটা ঠিক কি?  আজকাল প্রায়ই জানালার ধারে বসে থাকে সাদাৎ, কথাও খুব একটা বেশি বলে না।  একবার ভাবে বলে চল ফিরে তোমার বাড়ি, যত অসুবিধেই হোক মানিয়ে নেব।

মাথায় হাত রাখতেই সাদাৎ-এর কান্না শুরু হয় হাউ হাউ করে।  এযেন ডুকরে ওঠা কান্না।  বেরোয় দমকে দমকে।  আটকে থাকা যন্ত্রণা।  খানিক সময় পেরিয়ে বলে, " মৌলবীসাহিব আর নেই। "

গায়-পিঠে হাত বুলিয়ে নিমিতা বলে, " কেউ চিরকাল থাকে না সাদাৎ। "

ফুঁপিয়ে কেঁদে সাদাৎ উত্তর দেয়, " জানি, কিন্তু আমার খারাপ লেগেছে আব্বাজান একবারও জানাল না আমাকে।  কেউই খবর দেয় নি।  পাড়ার মোড়লেরা সবাই ভুলেই গেছে, এমনকি আমার ছেলেবেলার বন্ধুরাও।  একটা ফোনও তো করতে পারতো।  আমিওতো মৌলবীসাহিবের সন্তানতুল্য।  তারতো আলাদা টান ছিল আমার প্রতি।  সকলে আড়ালে বলে বিধর্মী।  আমি কোন ধর্ম ছাড়লাম?  তুমিই বল ভালবাসা কি ধর্মের থেকেও ছোটো?  আল্লাহ কি ভালবাসেন নি? "

নিমিতা কাছে টেনে নেয় সাদাৎকে, এখন তার ভূমিকা মা'র।  ছেলে ভুলোতে হবে।  অথচ এই মানুষটাই সম্পূর্ণ অন্যরকম ছিল বছরকয়েক আগে।  বাড়ি ছাড়ার পরই বদলে গেছে।  ঝিমিয়ে থাকে প্রায়সময়।  এইতো পুরী যাবার কথা হচ্ছিল পাশের ফ্ল্যাট-এর বৌদির সাথে, কিন্তু কি বলবে এই মানুষের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলতেই ইচ্ছে করে না।  প্রতিদিন সকালে দোকান, এখন সাথ দেবার জন্য নিমিতাও যায়।  প্রেসের কাজ, একটু অদেখা হলেই সব গায়েব।  একটা ক্লায়েন্ট ছাড়লেই বদনামের একশেষ।  অবশ্য নিমিতার বাড়ি ব্যাবসায়ীর বাড়ি, ব্যাবসা সে ভালই বোঝে।  আজ যায় নি শরীর ভাল নেই তাই বাড়িতে।  যদিও আড়ালে আবডালে অনেকেই বলে বৌ ব্যাবসার পাট চুকোবে।  আর সাদাৎ-এর বাড়িতে লড়াই ছিল সেখানেই। 

আলগা ভালবাসার ছোঁয়া দিয়ে নিমিতা বলে, " তোমার জন্য মৌলবীসাহিব একটা উপহার দিয়ে গেছেন যাবার আগে।"

মানে?  সাদাৎ চমকে ওঠে।

নিমিতা ভেতরের ঘর থেকে বার করে আনে একটা প্যাকেট।  হাত বাড়িয়ে বলে, দেখে নাও। 

ভারী প্যাকেটটা খুলতে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, " কবে তোমার সাথে দেখা হলো মৌলবীসাহিবের?" 

" সে এসেছিলেন দিন কয়েক আগে প্রেসে, ও কথা থাক।  এখন খোলোতো দেখি প্যাকেটটা।  আমি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলাম কি আছে প্যাকেটে? কিছুতেই উত্তর দিলেন না।  শুধু বললেন আমি না থাকলে ওকে দিও।" নিমিতা উত্তর দেয়। 

সাদাৎ যত্ন নিয়ে পলিথিনের মোড়ক খোলা শুরু করে।  বড় একটা মোটা কাঁচের ডাব্বা, ভেতরে ছোটো বড় নানান কাঁচের গুলি।  চোখ চকমক করে ওঠে সাদাৎ-এর, বোঝে এ তার ছেলেবেলার স্মৃতি।  যত্নে ছিল।  অথচ ছোটোবেলায় যতবার চেয়েছে মৌলবীসাহিব না বলেছেন।

দৌড়ে গিয়ে এক ঝাঁকুনিতে বিছানায় উল্টে দেয় ডাব্বাটা।  শুরু হয় ছেলেমানুষি, ভুলে যায় মৃত্যু শোক।     

এবার নিমিতার লাজুক হবার পালা, কোনোওরকমে চোখে-চোখ রেখে বলে, " আরোও একটা খবর আছে।  তুমি বাবা হতে চলেছ। আর মৌলবীসাহিব এটাই তোমার সন্তানকে দিতে বলেছেন।"

মুহুর্তে ঘরের পরিবেশ বদলে যায়।  দ্বিগুন খুশির ঝলক সাদাৎ-এর চোখে-মুখে।  খানিক পায়চারি করে বলে, " বিরিয়ানি, আজকের মেনু বিরিয়ানি আর চিকেন রেজালা। " 

নিমিতার প্রিয় ডিশ।  দুজনের শুরু হয়েছে বকবকম।  কতই না স্বপ্ন সন্তানকে ঘিরে, ছেলে না মেয়ে।  সাদাৎ-এর পছন্দ মেয়ে আর নিমিতার ছেলে।  তা নিয়ে আগেও একপ্রস্থ হয়েছে।  ভাল করে পেটপুরে খাওয়াদাওয়া করে নিমিতা বিছানায় শুয়ে বলে, " হ্যাঁ গো, একবার মাকে বলে আসবে আমার খবর।  মা নিশ্চয় আসবে দেখতে। এসময় একলা থাকাটা একটু চাপের বলে নিমিতা চুপ করে যায়। " 

সাদাৎ কিছু না ভেবেই সায় দেয় কথায়।  তার মাথায় শুধুই ঘুরছে মৌলবীসাহিব ও তার নিজের ছেলেবেলা।  সেই গুলি-ডাংগুলি খেলা সকলের সাথে উঠোনে, হৈ চৈ- আনন্দ- রাগ- ঝগড়া-মারপিট-কান্না।  তার সাথে মৌলবীসাহিবের স্নেহের পরশ।  একদিন দুপুরে সকলের আড়ালে তাকে ডেকে নিয়েছিল, একটা চকোলেট হাতে ধরিয়ে বলেছিল - দেখিস আমি তোর সাথে সবসময় থাকব।

মাঝরাতে জানালার ধারে দাড়িয়ে সাদাৎ-এর বোধ হয় মৌলবীসাহিব কোথাও যান নি, গুলির কৌটোর সাথে নিজেকেও রেখে গেছেন, নিমিতার শরীরে বাড়ছেন আবার খেলবেন বলে।  নিজেকে নিশ্চিন্ত বোধ হয়।       



  

Popular Posts