হেলথ-কেয়ার সার্ভিস

ছেলের মুখ দেখে সকাল শুরু হয় বলে বেশ ভাল লাগে। অনেক ব্যথা ভুলে থাকা যায়। কিন্তু আজ সকাল হতেই মনটা বিগড়ে গেছে নিউজপেপারে একটা ছবি দেখে। এক প্রচারমুখি ডাক্তারের কান্ড, নিজেই নিজেকে হেল্থ কেয়ার সার্ভেন্ট বলে স্বমহিমায় বিরাজমান গ্লোরিফায়েড ব্যাবসায়ী। তার এই গোষ্ঠীগুলির উপর ক্ষোভ বহুদিনের। শুধুই প্রিটেইন্ড করে চলেছে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন সংবাদপত্র গোষ্ঠিও সামান্য কিছু সুবিধের বিনিময়ে এঁদের প্রোমোট করেন। এই প্রজাতির মানুষ শুধু এই পেশায় নয় বিভিন্ন পেশায় বর্তমান। এমন ডাক্তার মানুষও পেয়েছি যিনি ব্যাবসা করার স্বার্থে নিজেকে প্রায় নোবেল পুরষ্কারের যোগ্য ঘোষণা করেন আর কি !
তার স্ত্রী গত হয়েছে ক্যান্সারে। এই সময় সে ভিন্ন-ভিন্ন মানুষের সংষ্পর্ষে আসে ও অনেকেরই স্বরুপ দেখে। কেউবা পুজোর যোগ্য, কেউ শব্দের ব্যাখ্যার বাইরে। তাদের সম্পর্কে কথা হবে পরে অন্যকোনোও সময়, অন্যকোনোও ভাবে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার পেশাটির সম্পর্কে একটু বীতশ্রদ্ধ ছিল এবং এখনও যে খুব একটা ভাল নজরে দেখে তা নয়। তবে এটুকু বুঝেছে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত আমরা সকলেই সময়ের স্রোতে তলিয়ে যাচ্ছি। এ সময়ের নিয়মেই এগোচ্ছে (পেছোচ্ছে!)। ব্যাতিক্রম যে নেই তা নয়, খুবই সীমিত। ভয় হয় পরবর্তীকালে কোথায় ঠেকবে? অনেকতো নামি-দামি ব্যাক্তিত্ব দেখা হলো, সকলেই অনিশ্চয়তা রোগে ভুগছে। তারই পরিনাম মধ্যবিত্ত সৃষ্টিশীলতা।
ইনোভেটিভ শব্দটা একমাত্র বোধহয় ব্যবসায়ীদের কাছেই রয়ে গেছে। সকলেই নিত্ত-নতুন চমক দিতে ব্যস্ত। ঠিক যেমন ঐ আজকের খবরকাগজের ঐ পুরষ্কারপ্রাপ্ত ডাক্তার, চুলের ট্রিটমেন্ট করা হেলথকেয়ার সার্ভিসের দিকপাল, বলিউডের তারকাদের সাথে নাচে বেশি আগ্রহ ট্রিটমেন্ট-এর থেকে।
এদেশে শুধু নয়, আমার বোধহয় সারা বিশ্বে স্বাস্থ্য ও তাকে ঘিরে পরিষেবার ব্যবসা বিরাট মাত্রায় বেড়েছে। আমরা সবাই বলি সেবা, আদপে ব্যবসা।
মাসকয়েক আগের কথা - সে এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হাসপাতাল, সেবার ভাব নিয়েই পরিচালন ব্যবস্থা!! তারই কথায় আসছি।
ছেলের ইউরিন ইনফেকশান হয়েছে, মা-হারা ছেলের ঐ মুহুর্তে দেখার কেউ নেই, কষ্ট পাচ্ছে ভীষণ। যন্ত্রনায় ছটপট করা বাচ্চার ডাক্তারের অপেক্ষার সময় কোথায়। কোনোও এক সহৃদয় ইনটার্ণ থাকতে না পেরে ইমার্জেন্সিতেই ক্যাথিটারাইজেশান করেন কারন হসপিটালে বেড খালি নেই ও বাচ্চার রিলিফ হয়। পরিনাম - সিনিয়ার ডাক্তারের জুনিয়ার ডাক্তারকে বকুনি ও বাচ্চার বাবার সাথে উনার মতবিরোধ। কারনটা খুবই সাধারণ -  ছেলের বাবা সিনিয়র ডাক্তারের কথায় বাচ্চাকে আর অ্যাডমিশান করাতে চায় নি, অযথা তিন বছরের বাচ্চার সিস্টোস্কোপি করানোর কোনোও প্রয়োজন ছিল না বলেই সে মনে করেছে।
এঘটনার আলোচনার কারন একটাই সেরকম কোনোও জোরালো কারন ছাড়াই ( এক্স-রে হয়েছে, ব্লাড টেস্ট হয়েছে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি হয়েছে) একটি বাচ্চাকে অ্যাডমিশান করিয়ে সিস্টোস্কোপি করানোর যৌক্তিকতা কতটা কে ঠিক করবে? ডাক্তার নিশ্চয়, কিন্তু ডাক্তারের ইন্টেনশান সঠিক কিনা কে ঠিক করবে? এমনতো নয় ডাক্তার না হলে ইন্টেনশান বোঝা যাবে না?
আরেক গুনি মশাই-এর কথা না বললেই নয়। সেই একই জায়গা শুধু ডাক্তার বদলেছে। কানে ব্যাথার কারনে ই এন টি স্পেষালিষ্ট দেখানোও স্বাভাবিক। তিনি এলেন, দেখলেন, টেস্ট লিখলেন। রিপোর্টে পাওয়া গেল থাইরয়েড প্রব্লেম! ছোট্ ছোট্ এন্ডোক্রিনোলজিস্ট-এর সন্ধানে। পাওয়া গেল এক সিনিয়র ডাক্তারের খোঁজ। তিনি দেখলেন, না বলে বলা ভাল তাঁর জুনিয়র দেখলেন, এক্স-রে করালেন এবং রেফার যথারীতি পেডিয়াট্রিক এন্ডোক্রিনোলজিস্ট-এর কাছে। আবার অপেক্ষা!
দিনদুয়েক পর অফিস থেকে বিরতি নিয়ে অগত্যা হাজির হাসপাতালে। দুপুর একটায় এসে বসেই থাকেন, ডাক্তারের দেখা আর পাওয়া যায় না। একদিকে অফিসের তাড়া অন্যদিকে ছেলের শরীর। এক সিস্টারকে প্রশ্ন করলে নিরুত্তাপ উত্তর আসে, ডাক্তারবাবুকে ফোন করা যাবে না। আপনার কোনোও কিছু বলার থাকলে উনাকে অথবা অ্যাডমিন-এ বলুন। প্রায় ঘন্টাদুয়েক পর এলেন ডাক্তার সাহেব! এসেই আবার ব্লাড টেস্ট, কারন আগের টেস্ট-এর সময় বাচ্চার সর্দি ছিল কাজেই রিপোর্ট চেঞ্জ হতে পারে। ভ্যালিড লজিক।
একটু সাহস করে বলে, ডক্টর এক্স-রে রিপোর্ট দেখবেন না?
ডাক্তারের তড়িৎবেগে উত্তর আসে, " আগে যা বলছি করান, পরের কথা পরে হবে। "
বেশ কিছুদিন টেস্ট-এর ভিসিয়াস সার্কেলে ঘোরাফেরা করে ক্লান্ত হয় ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। শেষে হাজির হন এক হোমিওপ্যাথ-এর কাছে।
একথা সেকথা সেরে সেই ডাক্তার প্রশ্ন করেছিলেন আপনার সানসাইনটা কি? যেন সানসাইন দিয়ে ছেলের ট্রিটমেন্ট হবে।
আর ওপাড়া মাড়ায় নি। এখনও সে পাড়ার সাধারন ডাক্তারের কাছেই ছেলেকে দেখায়? ছেলেও খুশি, ছেলের বাবাও !

Post a Comment

Popular Posts