মিতিনমাসি, বিদায়

সেই ছেলেবেলায় স্বপনকুমারের হাত ধরে ডিটেকটিভ গল্পের ভাঁড়ারে হাত বাড়ানোর শুরু। স্বপনকুমারের গল্পের লেখক কে সঠিক তাই জানা নেই বা মনে নেই তবে তার সৃষ্ট গোয়েন্দা দীপক চ্যাটার্জির কান্ডকারখানা গোগ্রাসে গিলেছি একসময়। গুগুল করলে নিশ্চিত মিলবে লেখকের ইতিহাস, কিন্তু ইচ্ছে নেই আজ। স্বপনকুমার ছাড়িয়ে শুকতারা-আনন্দমেলা-কিশোরভারতী-সন্দেশ। আমরা সকলেই প্রায় চল্লিশের এপাশ-ওপাশ এই যাত্রাপথে পাড়ি দিয়েছিলাম বলেই মনে হয়। এছাড়াও কিছু শহুরে কনভেন্ট শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে অন্য গোয়েন্দা গল্পের পোকাও হয়েছিল আশাকরি। স্বপনকুমারের গল্পের হাত ধরেই গোয়েন্দা গল্পের শিখরে চড়া। সেখান থেকে ফেলুদা, গোগোল, ব্যোমকেশ, সন্তু-কাকাবাবু, কর্ণেল, অর্জুন, ও শেষমেষ মিতিন মাসি। অবাক করে আমাকে যে আমরা কখনই কাকাবাবু-সন্তু বললাম না! মিতিন মাসির পর বাংলা গোয়েন্দা গল্পের ভাঁড়ার নিশ্চিত এগিয়েছে, কিন্তু আমার ভাঁড়ার বাড়েনি। থেমে গেছি ওখানেই। গোগোলের মৃত্যুর ( লেখকের মৃত্যু) থেকে আমার বিয়োগব্যাথার শুরু, শেষ হলো বলতে পারি না তবে মিতিনমাসির অভাব বোধ করব তা নিয়ে কোনোও সন্দেহের অবকাশ রাখে না।
বড় হয়েছি, প্রবাসী হয়েছি, বদলেছে জীবনের অনেককিছুই। বড় বদল হয়েছে জ্ঞানের ভাঁড়ারে। নানান সাহিত্যের সাথে আলাপ হয়েছে। গোগ্রাসে গল্প গেলার সময় জানা ছিল না ছোটগল্পেরও ছোটগল্প হয়, অর্থাৎ ফ্ল্যাশ ফিকশান বা অনূগল্প। এই দিন কয়েক আগে আলোচনা হচ্ছিল বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্প ঠিক কি রকম। আমার উত্তর ছিল একটাই - শার্লক হোমস্ - আগাথা ক্রিস্টি - এরকুল পোয়ারো - মিস মার্পল - ওয়াটসন সব মিলেমিশে এক হয়ে যা হয় সেইরকম। শুধুই শার্প ইন্টেলিজেন্স। আলোচনার সূত্রপাত ব্যোমকেশ-এর নতুন এক ফিল্ম-এর হাত ধরে।
এখনও অনেক বছর চল্লিশের ঘরের মানুষ পাওয়া যাবে যেখানে আনন্দমেলা গুছিয়ে রাখা আছে। রাখা আছে শুকতারাও। সময়ের সাথে আমার অনেককিছুই হারিয়ে গেছে তারমধ্যে আনন্দমেলা-শুকতারা অন্যতম। অনেকসময় বসে থাকার অবকাশ হয় মনে পড়ে বহু পুরোনো গল্প-উপন্যাস-বড়গল্প। তখন বুঝি কিছই হারায় না। কিছুটা বড় বয়েসেই নিজের লেখার শুরু। নানান গল্পের ছাপ নিশ্চিত পড়ে লেখায়, যেমন পড়ে জীবনের ছাপ।
ছোট বয়স পেরিয়ে যুবক হয়েছি। পড়ার শখ বেড়েছে বই কমেনি। তখন কলকাতায় থাকি। মৌলালীর যুবকেন্দ্রের লাইব্রেরীর কল্যানে পড়ার বই-এর অভাব ঘটেনি। এটা দেখেছি পড়ার ইচ্ছে থাকলে বহু জায়গা আছে ভাঁড়ার নিয়ে বসে। এইসবের মাঝেই আনন্দবাজার গ্রুপ একসময় বাজারে নিয়ে এল উনিশ-কুড়ি। নতুন মোড়কে আনন্দমেলা কিছুটা বড়দের জন্য। যথারীতি অ-কেজো মানুষ আমি উল্টে-পাল্টে দেখি উনিশ-কুড়ি। চোখ আটকে যায় ভাইরাস নামের একটি ছোট গল্পে। ছোট গল্প না বলে অনুগল্প বলা ভাল। তৈরি হলো মাপকাঠি আমার জীবনে। এইরকম লিখতে হবে। গল্পটা বললাম না তবে লেখিকার নাম - সুচিত্রা ভট্টাচার্য্য। যদি কেউ কোথাও পান পড়ে নেবেন। অনুগল্প বা ফ্ল্যাশ ফিকশান ঠিক কি হওয়া উচিৎ তার মাপকাঠি।
লেখা তো সাধনা তাই চালিয়ে যাই যদি কখনও ঈশ্বর এই অধমকে অন্য একটা ভাইরাস লেখার শক্তি দেন। আমরা তো খুবই ছোট্ট সৃষ্টির নিরিখে তাই প্রার্থণা করি সুচিত্রা দিদি ভাল থাকুন অশরীরে, আবার আসুন এই বাংলায় অনেক-অনেক ভাইরাস লেখার জন্য। খুঁজব প্রাণ্পণ মিতিনমাসিকে পাতায়-পাতায় ভীষণ-ভীষণ-ভীষণ ১৪২৩ পূজবার্ষিকিতে।
Post a Comment

Popular Posts