কৈলাশ বার্তা

1975: রঙ্গমঞ্চ


পাপা পাপা বিস্কুট দাও।
কেন কি হলো? ক্ষিদে পেয়েছে?
না আমাদের কালোকে (কুকুর) বিস্কুট খাওয়াবো। ওর খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কথা বলছে না।
কি করে বুঝলে?
চল দেখ না ওর পেট টা পড়ে গেছে।
ওহ....। বেরিয়ে দেখি আমাদের কুকুর কালোকে কেউ ছুরি মেরে গেছে পাশে লাগানো পোস্টার - শ্রেণীশত্রু নিপাত যাক।


1985: রঙ্গমঞ্চ


পাপা পাপা টিভিটা চেঞ্জ করতে হবে।
কেন?
কালার টেলিভিশান নিতে হবে। আমি ইন্ডিয়া-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট সিরিজ দেখব।
কি করে দেখবে? চ্যানেল তো আসে না।
না.. দূরদর্শন দেখাবে বলেছে।


1995ঃ রঙ্গমঞ্চ


পাপা সব চেঞ্জ হয়ে গেছে না?
কিরকম? তুই কি বলছিস্ আমি ঠিক বুঝছি না।
না আমি বলছিলাম.. মানে কত নতুন চ্যানেল, নতুন টিভি। সেদিন আমাদের অনেকে বলছিল কম্পিউটার এলে অনেক চাকরি হবে। পাড়ার হাবুদা ঐযে পার্টি করা হাবুদা চা-এর দোকানে উল্টো গান গাইছিল। বললে কম্পিউটার এলে সবার চাকরি চলে যাবে। তোমার কি মনে হয় পাপা?
বেটা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার নামই জীবন। তার লয়ে পা ফেলে এগোনোর মধ্যে শিক্ষার আনন্দ লুকিয়ে থাকে। পার্টি করা লোকজনেরা ওসব বোঝে না।
তাহলে তুমি বলতে চাও পাপা কম্পিউটার কোনোও ক্ষতি করবে না!!
না। উল্টে তোদের অনেক সুবিধে করে দেবে।


2005ঃ রঙ্গমঞ্চ


পাপা জব প্রস্পেক্ট এখানে কমে আসছে। বাইরে যাই?
যেতে পার? আমার অসুবিধে নেই। তবে এখানে সেট্ল হতে পারলেই আমাদের দুজনের ভাল লাগত। তুমি আমাদের একমাত্র ছেলে।
পাপা, তুমি না কিরকম হয়ে গেলে। একবারতো বলতে পারতে না তুই এখানেই থেকে যা। আমার অফার অনেকগুলো এসেছে, কিন্তু যেতে চাইছি না। এখানেই কিছু একটা করে ফেলি।
ভাল। তাহলে থেকেই যাও। এখানেও নিশ্চয় পরিবর্তন হবে। সময় কোথাও থেমে থাকে না। বদলায়।
কিন্তু পাপা কি করব? সবই তো স্থবির!


2014ঃ রঙ্গমঞ্চ


চলছে না চলবে না। মানছি না, মানব না। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বন্ধ হোক। শাসক গোষ্ঠী নিপাত যাক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কলুষিত করা চলছে না, চলবে না। নারীর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলছে না চলবে না।



2014ঃ প্রবাসী


এখন আর পাপা নেই। তিনি গত হয়েছেন প্রায় দুবছর। ছেলেকে নিয়ে সানডেতে বেড়ানোর অভ্যাস আমার সেই ছেলেবেলা থেকে। ছেলে আবদার করে - পাপা গাড়ি কিনবে? ই এম আই বেশি নয়।
মুচকি হেসে সাই দিই কথায়। আজ বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে মনে হয়, আর আবেগপ্রবণ হবো না তবুও হয়ত সেই ভুলটা করেই বসব।
ছেলে বড় হয়েছে, তার নানান প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজতে হয়। পার্কের ধারের চেয়ারে বসে হাঁফ ছেড়ে ছেলে প্রশ্ন করে, " পাপা ইউ অ্যান্ড মম্ ওয়ার ওয়াচিং টিভি অন দ্যাট ডে অ্যান্ড আই ফোলোওড ইউ, ডু ইউ নো হোয়াট ডু দে মিন বাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চলছে না চলবে না? "
সব কথার উত্তর তো আর বড় হলে বুঝতে পারবে বলা যায় না, এই প্রশ্নের উত্তর সোজা-সাপটা দেবার কথা ভাবলাম। সেই উত্তরটাই ছেপে দিলাম।
" বেটা দেয়ার ইজ অ্যানাদার পার্ট অফ দ্যা ইউনিভার্স হোয়্যার ইনটেলেক্ট ইজ মোর পাওয়ারফুল। ইন্টেলেক্ট বেড়ে গেলে কাজ কমে যায়, তারই ফসল এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, চলছে না চলবে না।" বেশ খানিক ছেলে আমার দিকে চেয়ে থাকে।
আমি আবার শুরু করি বেটা, " ওয়ার্ক ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান ইন্টেলেক্ট। ইফ ইউ ইগনোর ইউ উইল বি নোহোয়্যার! হোপ, দ্যা আদার পার্ট অফ ইউনিভার্স উইল বি ওয়াইজ এনাফ সাম ডে টু অ্যাভয়েড চলছে না চলবে না।"


2014ঃ স্থান কাল পাত্র কৈলাশ


সকলে এসে বসেছেন কৈলাশে, শিববাবার চোখ ঢুলু-ঢুলু।
নারদ এলেন ধীরে কাছে এসে কাঁচু-মাচু মুখে বলেন - বাবা, দেবরাজ ইন্দ্র কিছু বলতে চান।
শিববাবা অর্ধনিমিলিত চোক্ষে ইশারা করেন বল।
দেবরাজ ইন্দ্র- দেবাদিদেব এবার মা পার্বতীর বাপের বাড়ি যাওয়া কি ঠিক হবে? যদি কিছু দুর্ঘটনা ঘটে। আমার বড়ই ভয় হচ্ছে।
পার্বতী কিছু বলতে গেলে দেবাদিদেব ইশারায় চুপ করতে বলেন।
দেবরাজ ইন্দ্র- নারায়ন অনুরোধ করেছেন মা পার্বতী এবার কি না গেলেই নয়। উনি গেলে তো আমার লক্ষীও যাবেন। তার কিছু হলে আমি বাঁচি কি করে? যা সব আরাবুল-হারাবুল, পন্ডা-হন্ডা, মদন-হারাধনের দল দেখছি কখন কি করে বসে। তারওপর শালী স্বরস্বতীও যাবে। তাকে নিয়েও যদি টানাটানি শুরু করে। যা কামদুনি দেখালেন! আমি তো ভাবতেই পারছিনা মা তোমার বাপের বাড়ির এই অবস্থা। কার্তিক-গনেশ কি কিছু করতে পারবে? ওরাতো কারোও কথায় শুনছে না...
বেশ খানিক থেমে দেবরাজ ইন্দ্র আবার বলেন - দেবাদিদেব মহাদেব আপনি কি বলেন?
গনেশ দূরে দাড়িয়ে দেবরাজ-এর কথা শুনছিলেন। তিনি এগিয়ে এসে বলেন, " বাবা আমরা যাব। তুমি বলে দাও নারায়নকে গনেশ তার বোনের মর্যাদা রক্ষা করতে জানে।"
কার্তিক চুপচাপ দাড়িয়ে, নির্বাক। বছরে এই একটি বারই তো সে আনন্দ করে। তার আর কি কাজ ময়ূর নিয়ে কার্তিকগিরি করা ছাড়া। না গেলে মা'র বাপের বাড়ির কতই না সুন্দরী মেয়ে দেখা হবে না। বেশ লাগে দিনে-রাতে মর্ত্তের সুন্দরী রুপসী অপ্সরা দেখতে।
স্বরস্বতী মা'র গা ঘেঁষে দাড়ায়, তার মন খারাপ। একি কামদুনি-জামদুনির জন্য তার ফোলোয়াররা তাকে পাবে না!! সেও বেঁকে বসে মা'র আঁচল ধরে; ভাব এই যে- মা তুমি বাপিকে কিছু বল।
পার্বতী তো রেগে লাল। নেহাতই দেবরাজ ইন্দ্র ও তার লক্ষীর নারায়ন বলে এখনও রক্ষে, কিছু বলে নি। কৈলাশ থরথর কাঁপমান, সকলে বুঝেছেন পার্বতী রেগে আগুন সব শুনে। তার বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ কোনোওভাবে সম্ভব নয়। এটা দীর্ঘদিনের প্রথা। এই সময় মর্ত্তে নামতেই হবে।
শিববাবা অনেক পরে চোখ খোলেন। পার্বতীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যান। বোঝেন আগুন জ্বলছে। খানিক ভয়ে দেবরাজের উদ্দেশ্যে বলেন- নারায়ন কে বল লক্ষী মাকে আমার পাঠাতে। পার্বতী অসুর দমনে যাবেন মর্ত্তে। এবার শুধু অসুর নয় অসুরী শক্তিরও বিনাশ অবসম্ভাবী।
তারপর তিনি গনেশকে বলেন, তুমি বাবা মর্ত্তের সারিদা ব্যাবসায় যেয়ে বসবে না। মা স্বরস্বতী যাদবপুরে যতই কান্ড হোক তুমি প্রবেশ করবে না, তোমার আবার পড়াশুনার বাতিক আছে। ওখানে এখন পড়াশুনা দীর্ঘদিন বন্ধ!!! কার্তিক তুমি পার্কে যেয়ে কার্তিকগিরি করবে না, পার্কের পরিবেশ এখন কলুষিত। আর লক্ষীমা এলে বল ছটপট করে শেয়ার বাজারে যেন প্রবেশ না করে। এমনিতেই ওখানের আর্থিক অবস্থা খারাপ আরোও খারাপ হলে সকলে দুঃখ পাবে।
এবার নারদের দিকে ঘুরে বলেন, " নারদ তুমি যাও সব ব্যাবস্থা কর। দেবরাজ তুমি নিজের কাজ কর গিয়ে আর নারায়নীকে এখানে তাড়াতাড়ি কৈলাসে পৌঁছে দাও।"
কৈলাশে কেলেঙ্কারি এড়ানোর একটাই উপায় পার্বতীমাকে খুশি রাখা তা শিববাবা ভালই বোঝেন!! রাত্তিরে পার্বতী দেবাদিদেব মহাদেবের চরনে হাত দিয়ে বলেন - কি দরকার ছিল এখানে একা থাকার। আপনিওতো সাথে যেতে পারতেন। আপনি থাকলে বুকে বল পাই। আপনি বরাবরই মাকালীর সাথেই মর্ত্তে যান, আমার কথা ভাবেনই না !
Post a Comment

Popular Posts