ঘরে ফেরার পথ


দেবাশিস্ ভট্টাচাযর্্য 

ভোরের আলো ফোটার আগেই এই শহরের মানুষ জেগে যায়, এটাই নিয়ম এই শহরের।  সময় নেই, তাকানোর সময় নেই, দেখার সময় নেই, ভাবার সময় নেই, অনুভবের সময় নেই।  সবাই ছুটছে।  থামার অবসর কৈ?

নিধি শহরে নতুন। ভোরের আলো দেখা, ভোরের গন্ধ নেওয়া তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তি।  সদ্য ফোটা ফুলের কঁুড়ির মত শহরও জাগে, ধীরে ধীরে। 

পাশের পার্কটায় ঢোকা মনস্থ করে সে।  বৃষ্টির ঋতু পেরিয়েছে, কিন্তু বর্ষার সোঁদা গন্ধ এখনোও কাটেনি।

গুড মর্নিং ম্যাডাম।  বেশ আমেজ নিয়েই বলা কথাটা ভেসে আসে।  প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই দেখে, এক জোকার।  অবিকল মেরা নাম জোকারের রাজ কাপুর।  চোখ ঘষে নেয় নিধি।  গম্ভীরতা বজায় রেখে বলে- কে? আপনাকে তো চিনিনা

উচ্ছ্লতার সাথে উত্তর আসে, জোকার। মেরা নাম জোকার। দেখেননি? অবশ্য দেখার কথাও নই।  বয়সটাই হয়নি, বলেই পাগলের মত একপাক ঘুরে নেয়।

নিধি বোঝে সে পাগলের পাল্লায় পড়েছে। কোথায় থাকা হয়? বেশ রুঢ় স্বরেই কেটে কেটে উচ্চারণ করে শব্দ্গুলো।  

হি হি হি হি…. সব হাসিগুলোয় যেন লুকিয়ে আছে দুঃখ, ঘোষণা করে- আমি সেখানেই যেখানে দুঃখ।

এখানে কোথায় দুঃখআপনি কি পাগল!

এক ছুটে নিধির পায়ের কাছে এসে বসে পাগল, আলতো স্বরে মীটিমীটি চোখে বলে, দুঃখ কোথায় নেই। আমরা সব মোবাইল জগৎএর মানুষ।  দুঃখও মোবাইল হয়ে গেছে।  এইতো কামদুনি, দিল্লি, আফ্রিকা, মুম্বাই, সিরিয়া সব এক হয়ে গেছে।  বৃষ্টি নামার মত শুধু দুঃখ নামার অপেক্ষামাত্র।

বুঝলাম না।  খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েই নিধি উত্তর দেয়।

তুমি দুঃখ দেখতে চাও? যাও ওপারে। যাও যাও শিগ্গির।

কি উল্টো-পাল্টা বলছ? বেশ উত্তেজিত হয়েই চিৎকার করে নিধি।

বেশ আমি এখানেই বসলাম বলে হনহন করে হেঁটে বেঞ্চটায় বসে সে। 

নিধি শব্দাহতের মত চুপ্চাপ পা বাড়ায় ঝাড়ের ওপারে।  বেশ জোরেই হাঁটে নিধি।  মাথাটা ঠান্ডা হওয়া দরকার। 

খানিক গিয়ে নজরে পড়ে দুটি বাচ্চা নুড়ি বিছানো রাস্তায় বসে খেলা করছে।  বৃষ্টি নেই তাই ছাতা উল্টোনো।  বোঝে প্রেমের প্রতীক।  পরিপুরক।  আরোও খানিক এগিয়ে দেখে একটি বুট পলিশ বাক্স একটি ঝোলা কাছাকাছি-পাশাপাশি রাখা, কিন্তু কোনোও লোক নেই। কিছু বোঝে না- এর সাথে দুঃখের কি সম্পর্ক আছে।  না থেমে এগোনোর সিধান্ত নেয় সে- দেখে পাথর বিছানো রাস্তার ধারে একটি কফিন রাখা কিন্তু কারোও দেখা নেই।  শুধু দুপাশে দুটি ফলক, কাছে এগোয়, বড় করে দুটির গায়ে লেখা- ধর্ষণ খুন।  নিধির উদ্দেশ্য এগোনো তাও সামনে ফাঁকা চেয়ার দেখে বসতে যায়, থমকে দাড়ায় চেয়ারের গায় লেখা - বসতে মানা। দুঃখের সাম্রাজ্য। 

নিধি পিছু ফেরে, দ্রুত হাঁটা দেয়, তাকে ফিরতে হবে……. ফিরতে হবে আনন্দের ঠিকানায়….   


Popular Posts