Bodh

বোধ

'স্যার', শব্দটি শুনে একটু চমকে তাকায় দিবাকর।  এইখানে এই বিদেশ বিভুই- কে তাকে ডাকবে।  এগিয়ে এসে ঢিপ করে প্রণাম ঠুকে বসে মেয়েটি।  চেনার চেষ্টা করে অনেক।  ঠিক মনে করতে পারে না।  ডাকবিভাগে চাকরি করে।  পোষ্ট-মাস্টার।  ইউনিয়নের কোপে পড়ে ট্রান্সফার।  মেনে নিয়েছে।  প্রতিবাদ করেনি।
                                       কেমন আছেন স্যারবৌদি কেমন আছেআর মিতুনপরপর ভেসে আসে প্রশ্নগুলি।  প্রাণপণে চেষ্টা করেও মনে করতে পারে না।  বাধ্য হয়েই জানতে চায়, তোমাকে ঠিক….. । তুমি কে বলতো?
                                              মেয়েটি একটু থমকে যায়।  বেনীটা দুলিয়ে বলে, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন স্যার।  আমি নিভা।  এতক্ষনে দিবাকরের আবছা মনে পড়ে।  সেই ছোট্ট মেয়েটি।  এত বড় হয়ে গেছে।  বিয়ে হয়নি এখনও।
                                  চারপাশটায় একবার তাকিয়ে দেখে।  স্টেশনটা একদম ফাঁকা।  দূরে একটা গুমটিকে ঘিরে কয়েকটি যুবকের জটলা।  প্রশ্ন করে বসে, তুমি এখানে?  জানলেই বা কী করে আমি আসছি?
মেয়েটি হেসে ওঠে, এখানকার স্কুলে চাকরি করি।  ভাইকে ছাড়তে এসেছিলাম।  হঠাৎ দূর থেকে মনে হল, চেনা মুখ।  এগিয়ে এসে ঠিক ধরে ফেলি।
দিবাকর এবার বলে, তোমার নামটা কী যেন বললে?  নিভা এবার হেসে ওঠে।  বলে, স্যার আপনার বয়স বাড়ছে।  স্মৃতিশক্তিটাও কমেছে।  এক্ষুনিতো বললাম - নিভা।  দিবাকরের সবকিছু মনে পড়ে যায়।  বাবার হাত ধরে বাচ্চা মেয়েটি এসেছিল।  তখন কত আর বয়স হবে।  বারো কি তেরো।
               একটা সময় দিবাকর চাকরি বাদেও চুটিয়ে টিউশনি করত।  শুধুই অঙ্ক।  দুটো ব্যাচ।  একটা অফিস যাবার আগে।  আর একটা অফিস থেকে ফিরে।  রিতা সেসব দেখে খুব রাগ করত।  বলত তিনটেতো প্রাণী, কী এত টাকার দরকার?  রিতার আপত্তিতেই শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেয়।  আসলে ঠিক টাকার জন্য পড়াত না।  পড়ানোটা ছিল নেশার মত।  সেই ছোট থেকে পড়াচ্ছে।  কলেজে ওঠার পর বাবার কাছ থেকে কখনও পয়সা চায়নি।  ছোট থেকেই সেলফ্-মেড ম্যান হওয়ার প্রবল বাসনা ছিল।  হয়েছেও।  পুরো নাম দিবাকর সেন।  অফিসের এক কলিগ শুরু সবার 'সেন-দা'য় কখন যে পরিণত হয়েছে খেয়ালই নেই।  এখন স্যার, দিবাকর এই শব্দগুলো দিবাকরের কেমন অচেনা লাগে।
নিভা শুরু করে
- স্যার, আপনি এখানে?  কী ব্যাপার?
- ট্রান্স্ফার করেছে অফিস থেকে।  পানিশমেন্ট পোস্টিং।
- স্যার আমার বাড়ি চলুন।  তারপর অফিসে যাবেন।  সামনেই পোস্ট-অফিস।  দেরি হবে না।  
এবার দুজনে হাঁটা দেয়।
- স্যার, মিতুন কত বড় হল?  রিতাদি নিশ্চয় ভাল আছে? একরাশ প্রশ্নমালা হাজির করে হাঁটতে হাঁটতে।
দিবাকর উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করে, তুমি বিয়ে করনি?  নিভা একটু চুপ করে।  তারপর আবার বলতে শুরু করে, ' গ্রাজুয়েশানের সময় বাবা মারা যায়।  তারপর এই স্কুলের চাকরি।  ভাইটা নেট্-এর প্রিপারেশান্ নিচ্ছে, ও চাকরিটা পেয়ে গেলে তারপর বিয়ের চিন্তা।'
দিবাকর সব শুনে একটু অবাক হয় ভেতরে ভেতরে।  আবার প্রশ্ন করে, তুমি পড়াশুনোটা বাড়াচ্ছ তো, না থামিয়ে দিয়েছ?
- স্যার এই অজ পাড়াগাঁয়ে পড়ে থেকে আর পড়াশুনো এগোবে না।  চেষ্টা করছি কলকাতার দিকের স্কুলগুলোয়।  কিন্তু চাইলেই কি সব হয়?
দিবাকর নিরুত্তর।  আসলে বলার মত কিছু নেই তার কাছে।  ও নিজেও চিন্তায় আছে।  মিতুন-রিতাকে কলকাতায় ফেলে রেখে এখানে আসার ইচ্ছে মোটেও ছিল না।  কিন্তু উপায় কি?  মিতুনের ক্লাস টেন।  এখন স্কুল চেঞ্জ করা যাবে না।  এটা শেষ হলেই তো বারো ক্লাসের পড়া।  কাজেই তিনটে বছর এই পাড়াগাঁয়ে পড়ে থাকতে হবে।  তবু আশার আলো নিভা।  পুরোনো এক ছাত্রীতো পাওয়া গেল।  কিছুটা সময় কাটানো যাবে।
দিবাকর নিভার বাড়ি হয়ে একবার পোস্ট অফিস গিয়েছিল, অবশ্য নিভা ছিল।  ছোট্ট জায়গা, অফিসে ওকে নিয়ে মাত্র চারজন।  সবার সঙ্গে পরিচয়টা সেরে ফিরে আসে।  পরের সপ্তাহে জয়েন করবে।  দিবাকর ভাবে ইউনিয়নের সঙ্গে লড়াইটা না করলেই ভাল হত।  কলকাতা ছেড়ে এখানে তিনবছর কম করে কাটানো।  তার ওপর রিতা-মিতুন থাকবে ওখানে।  দু-দুটো এস্টাবলিসমেন্ট।  খরচাও তো আছে?
ভেবেছিল রাতে ফিরে যাবে।  ফেরা হল না।  নিভা প্রায় জোর করেই আটকে দিল।  বলল - স্যার অনেকদিন বাদে আপনাকে পেয়েছি।  আজ ছাড়ব না।  পুরোনো সব কথা হবে।
নিভা এখানে একটা বাড়ি ভাড়া করে রয়েছে।  দুটো রুম, বাথরুম আর কিচেন।  সামনে একফালি বারান্দা।  ভাড়া মাত্র বারোশো।  ঘরগুলোতে আসবাবপত্র বেশি নেই।  কিন্তু চারিদিকে রুচির ছাপ।  
                                                           বেতের চেয়ারটায় বসে ছিল দিবাকর।  নিভা চা নিয়ে এসে হাতে ধরায়।  বলে, স্যার বৌদিকে ফোনটা করে দিন।  চিন্তা করবে।
 দিবাকর ভুলেই গেছিল ফোন করার কথা।  চা খেয়ে ফোনটা করার জন্য তৈরি হয়।  নিভাই ফোনটা করে।  দিবাকর চুপটি করে বসে দেখতে থাকে নিভার কার্যকলাপ।  কচি কলাপাতা রঙের শাড়িটায় বেশ সুন্দর লাগছে।  নিভাকে।  প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে বকবক করল।  কত কথাই না জমে ছিল।  এক ধাক্কায় সব উগরে দিল।  শেষে নিভা যখন ছাড়ল ফোনটা, রিতার একটাই কথা
- না থাকলেই পারতে।  একলা মেয়ে!  অজ পাড়াগাঁ।  কত কথাই না উঠতে পারে।
কথাটা শুনে মনটা খারাপ হল।  চিন্তা হল।  নিভাতো একবার বলেই ফেলল, স্যার কী এত চিন্তা করছেন?
দিবাকর কোনওরকমে পাশ কাটায়।  বেমালুম মিথ্যে কথা বলে।  মিতুনের জন্য চিন্তা হচ্ছে।  বড় হচ্ছে তো।  শুনে নিভার কি হাসি।  বলে, মনে হচ্ছে আপনার মেয়ে বিবাহযোগ্য হয়ে গেছে।  চিন্তাতো করবে মা।  আপনি কেন?
দিবাকর চুপ করে থাকে।  আসলে নিভা নয়, রিতার কথাটার কোনও উত্তরই জানা নেই।  নিভাতো ছাত্রী, তাও সামাজিক ভয়।
- স্যার আর একবার চা করি।
     মাথাটা নেড়ে সায় দেয় দিবাকর।  নিভাকে দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চা বেলায় ফিরে গেছে।  তখন খালি বলত, আর নয়।  আর নয়, এবার একটু গল্প।
         চা করতে করতে বলে, স্যার আপনি যখন বকতেন যা ভয় লাগত।  আজ আর সে ভয় নেই।
                                                                      দিবাকর কপট রাগ দেখিয়ে ওঠে।  আজও বকতে পারি।  খিল খিল করে হেসে ওঠে নিভা।  দুটো কান ধরে বলে, আগেই শাস্তিটা নিয়ে নিলাম।  পরে আর বকতে পারবেন না কিন্তু।
                                                                                     নিভা হাসছে আর দিবাকরের ভেতর ভেতর চোরা টেনসন্ তৈরি হচ্ছে।  সত্যিই রাতটা কাটিয়ে কোনও ভুল করছে না তো?  বেশ তো ছিল।  রিতার কথাটা নিজের ওপর বিশ্বাসের ভিতটা নাড়িয়ে দিয়ে গেল।  উঠে দাঁড়ায়।  জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে থাকে।  পড়ে আসা বিকেল।  পাশের বাগানটার ফাঁক দিয়ে দুধারে বাড়ি।  মাঝখান দিয়ে মোরামের রাস্তা অন্য একটা মাত্রা এনে দিয়েছে।
                                     ঠক করে আওয়াজ হতেই ঘুরে তাকায় দিবাকর।  নিভা এসে দাড়িয়েছে টেবিলটার কাছে।  হাতে চা।  একটা কাপ টেবিলটার ওপর।
দিবাকর ভাবে কত তফাৎ হবে বয়সের।  তাও প্রায় পঁচিশ বছর।  এখন সে পঞ্চান্ন ছুঁই ছুঁই করছে।  এত বয়সের তফাৎ-এ মানুষ অন্য কিছু ভাবতে পারে?  চিন্তা করলেই গা-টা কেমন গুলিয়ে ওঠে।
নিভা হেসে বলে, স্যার কী এত ভাবছেন?  রাত্রে আজ খিচুড়ি, অমলেট্ আর বেগুন ভাজা।  বেশ উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে আসে।  খাটের কাছটায় দাঁড়ায়; স্যার, জানেন এখানে প্রায়ই ছাত্রীর বাড়ি থেকে তরি-তরকারি মাছ দিয়ে যায়।  শুরুর দিকে বেশ অস্বস্তি হতো।  এখন মানিয়ে নিয়েছি।  দিবাকর খানিকটা অবাক হয় নিভার উচ্ছ্বলতা দেখে।
                                            দিবাকর চেয়ারে বসে।  নিভা তখনও দাঁড়িয়ে  খাটের কাছটায় গিয়ে নিভা ঘুরে এসে দাঁড়ায়।  স্যার জানেন, অমিত বলে একটা ছেলের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল।  এখানকারই স্কুলের টিচার।  যাতায়াতটা বাড়তেই নানা কথা শুরু হয়ে যায়।  একদিন হঠাৎ অমিত এসে বলল, বিয়ে করবে?  আচ্ছা আপনিই বলুন, ভাই কিছু করে না।  সংসারটা আমার ওপরই চলে।  বিয়েটা কি করে করি।  মুখের ওপর না বলেছিলাম।  একটু থেমে আবার বলে,
                            কে জানে হয়ত সহ্য হয়নি।  সেই যে গেল আর আসেনি।  কিছুদিন বাদে অন্য একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে যায়।  দিবাকর মাথাটা নিচু করে চা-টা তোলে।  চায়ে মুখ দিতে গিয়ে তাকায়।  বলে, তুমি অপেক্ষা করতে বলতে তো পারতে?
নিভা চুপ করে যায়।  খানিক পরে মাথাটা তুলে বলে, ভাইও তাই বলেছিল।  কে জানে তখন কি মুডে ছিলাম।  ঠিক করে কথা বলিনি।
 দিবাকর বোঝে প্রসঙ্গটা বদলাতে হবে।  গুমোট ভাবটা কাটাতে বলে, চল আজকের খিচুড়িটা আমিই বানাই।  শুনে নিভার সে কি হাসি।  যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সেইভাবে বলে ওঠে, সত্যিই আপনি খিচুড়ি বানাবেন স্যার!
- হ্যাঁ, কেন অসুবিধে আছে নাকি কোথাও?
নিভা আরোও জোরে হেসে ওঠে।
- স্যার রাত্তিরে খাওয়াটা হবে তো?
- দিদিমনি, ডাকটায় চেতনা ফেরে দুজনের।  দেখে অবাক হই।  একটি বাচ্চা মেয়ে।  বই-খাতা নিয়ে হাজির।
বাচ্চাটাকে দেখে এক লহমায় ছোট্ট নিভার কথা মনে পড়ে যায়।  কি মনে করে, বাচ্চাটাকে পড়াতে বসে দিবাকর।  আর নিভা যায় রান্নাঘরে।
কোমরে আঁচল জড়িয়ে নিভা বসে রান্না করতে।  প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে নিভা এসে বিদেয় করে বাচ্চাটাকে।
দুজনে খেতে বসে।  খাওয়া শেষ হলে এবার শোবার পালা।  নিভা বাইরের ঘরেই স্যারের বিছানাটা করে দেয়।  চাদরটা পাল্টে, পাশবালিশটা দিয়ে পরিপাটি করে পাকা গৃহিণীর মত।  সব কিছু দেখে দিবাকর ভাবে - সত্যিই নিভা বড় হয়ে গেছে।
রাত বেড়েছে।  নিভা চলে গেছে তার ঘরে।  দিবাকরও শুয়ে পড়েছে।  সব কিছুই নিস্তব্ধ।  পাশ ফিরে তাকায়।  মাঝখানে শুধু একটি মাত্র দরজার পর্দা।  মনে মনে ভাবে, নিভা দরজাটা ভেজানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি।  সাত-পাঁচ ভেবে অস্থির ভাবেই ছটপট করেছে।  কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে খেয়ালই করেনি।
সকালবেলা ঘুম ভাঙে নিভার ডাকে।  গরম এক কাপ চা মনটাকে বদলে দেয়।  ভুলে যায় রিতার সাবধানবাণী।  ভয়টা যেন এক রাতেই উবে গেছে।  ভেতরে এক নতুন বোধ কাজ করতে থাকে।  নতুন সূর্য, নতুন ভোরের সঙ্গে নতুন বোধটাও জাগে।  সম্পর্কটা বড়, বয়সটা নয়।       

Popular Posts