বন-পলাশের পাঁপড়ি

লিকলিকে চেহারাটা নিয়ে সামনে দাড়াল, মুখে কোনোও কথা নেই চোখে কোনোও ভাষাও নেই।  সময় সব কেড়ে নিয়েছে এই প্রদেশের মানুষের।  সময় ভারী নির্মম কখনও দেয় কখনও নেয়।  এই দেওয়া নেওয়ার খেলা এই প্রদেশের মানুষের কাছে বিশেষত এই মানুষটির কাছে স্বাভাবিক।
সিকিউরিটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসে বলল - স্যার... আপনে বোলাথা। এহি রামু হ্যায়.. আপকা কুছভি জরুরত্ কে লিয়ে.. বড়া সাব নে বোলা আপকা তকলিফ নেহি চাহিয়ে.।
এর বেশি কথা হয় নি আমার সাথে।  ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন একটা গভীর বিষাদ ছায়া অথচ ভাবলেশহীন চোখ ধরা পড়ে।  আমার বাংলোয় সেবা করার জন্য সিকিউরিটির ব্যবস্থা।  সকাল থেকেই কাজে লেগে গেল।  কোনোও কথা বলার আগেই চা হাজির।  একটু পরেই বাটার টোস্ট। অবাক হয়েছিলাম প্রথমে, ভেবেছিলাম মুড়ি নিয়ে আসবে। হাতে নিয়ে বলি - ভাল হয়েছে।
উত্তর নেই। নির্বাক চোখেই প্রথম বুঝি ভাষা দেখতে হবে। এ-কাজ সে-কাজ গড়িয়ে বেলা অনেক পেরিয়েছে।  নিজের লেখার জন্য পাবলিশার-এর অ্যারেঞ্জমেন্ট।  ভিআইপি ট্রিটমেন্ট শুধুই দুটি লাইন কলম ব্যবহারের জন্য। পাঠককুল যেন খুশি হয় একথা ভাবতে গিয়ে পাবলিশার মশাই ভেবেছেন লেখক খুশি না হলে কেউই খুশি হবে না। পাহাড় ঘেরা এই জায়গায় হাতি, ময়ূর, বনমুরগি, দেখা গেলেও বাঘের দেখা মেলে না।  অথচ সিকিউরিটি সমানে বলে চলেছেন - সাব রাতমে বাহার নেহি নিকালনা।  চিতা ঘুমতা হ্যায়।
দুপুরের খাবার ভালই ছিল। বনমুরগির ঝোল আর ভাত।  সাথে টক দই সহযোগে রায়তা।  ভাতঘুম সেরেই একপ্রস্থ চা।  লিকলিকে মানুষটি সব করলেও মুখে রা নেই। বাইরে বেরিয়ে নজরে পড়ে গুটিকয়েক লোক রামুর সাথে গুজুর-ফুসুর চালিয়ে যাচ্ছে।  আমাকে দেখেই রামু চমকে ওঠে ও সাত তাড়াতাড়ি কিচেনের দিকে চলে যায়। একটু অবাক হয়েই আমি পা বাড়াই পিচের রাস্তার দিকে।
এই দিকটায় মানুষজন বিশেষ একটা নেই, একদিকে পাহাড় ও অন্যদিকে ফাঁকা মাঠ। বড় বড় লরিগুলি ঘররর... দুড়ুম-দাড়াম শব্দে পেরিয়ে যায় বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে। একঝাঁক সাঁওতাল মেয়ে পেরিয়ে যায় লাজুক মুখে, মাথা নিচু মুখ কলকল যেন ফোয়ারা ছুটছে। একটু এগোতেই দেখি হাট বসেছে। পা বাড়াই ওদিকে - নানান টুকরো-টাকরা শহুরে জিনিস ও অশহুরে কেজো জিনিসে ভর্তি, আর আছে প্রাণের স্পন্দন। একটি বাচ্চাকে দেখে অবাক লাগে। শহুরে মুখ, জীবন যাপনে শহুরে চিহ্ন। ওর দিকে এগোতেই লুকিয়ে যায়। বেশিক্ষণ বাইরে থাকা বারণ তাই ফিরে আসি আলো চলে যাবার আগে। ফিরে এসে টিভি ও গরম মাছ ভাজা, ফুলকপির ডালনা, বড়ির ঝাল সহযোগে মুগের ডাল।  মাঝরাতে ঘুম ভাঙে কিছু একটার নড়াচড়ায়, জানালার বাইরে আবছা আঁধারে অপরিস্কার দেখা ও শোনা যায়। কিচেনের দিকে কোথাও যেন এক বাচ্চার কান্নার শব্দ... 
আঁধার রাত, ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়াও রাত্তিরের নিজস্ব একটা শব্দ থাকে যা ছমছমে অনুভূতি এনে দেয়, তবুও বাচ্চার ডাক আমাকে দরজা খুলতে বাধ্য করে - বিবেকের তাড়নায় চলা আবেগপ্রবণ লেখক সত্তা। গুটি-গুটি পা বাড়াই বাচ্চার কান্নার শব্দের দিকে, কাউকে কোথাও নজরে পড়ে না তবে ফিসফিসানির শব্দ টানে আমাকে।  রান্নাঘরের বাইরে থেকে দরজা লাগানো, আলো জ্বলছে যদিও। শীতে গায় কাঁপুনি দিলেও উত্তেজনায় থরথর মন-প্রাণ। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখি সেই বাচ্চাটি ও রামু। বাচ্চাটি তারস্বরে কাঁদছে ও রামু মুখ নিচু করে বসে। অনেকক্ষণ দাড়িয়ে দেখি কৌতুহল বশতঃ। একবার ভাবি ডাক দিই আবার কি মনে করে পিছিয়ে আসি।
দিনকয়েক পেরিয়েছে - লেখার মাত্রা বাড়তে রামুর দিকে নজর কম এখন। সময় সময় খাবার এসে যায় আর আমি লিখে চলি নিজের মনে। লেখকের সত্তা সেই রাতকে নিয়ে হয়তো কাহিনী লিখে না বসে। দেখা যাক কি হয় !  

( চলবে )


Comments

Popular Posts