ধম্মপূজো

                                               (১)
ধর্ম শব্দটা শুনলেই গৌতম বুদ্ধের কথা মনে ভাসে, কিন্তু কেন কে জানে সোম ধম্মপূজো শব্দটা মা’র মুখে এত বয়স কাল ধরে শুনলেও কিছু মনে হয় নি বুঝতে পারে না।  সেই কোন ছেলেবেলা থেকে মা’র কাছে শুনে আসছে ধম্মপূজো।  সেটা যে কখন হয়, কেনই বা হয়???

মুখ ফুটে কোনোওদিন প্রশ্ন করে নি।  সত্যিটা এই যে, মনে প্রশ্নটা জাগে নি।  পূজোটা হয় মা’র গ্রামের বাড়িতে।  গ্রামের নাম মনিহারা। রাঢ়-এর দেশে কাশীপুর রাজার এস্টেটের গ্রাম।  বর্ধিষ্ণু গ্রাম তো নিশ্চয়।  ছেলেবেলায় মা’কে প্রশ্নও করেছে কোন মনি হারিয়েছিল।  যা হয় - উত্তর সঠিক আসে না।  সোমের একটু বেশিই প্রীতি আছে গ্রামটির ওপর, কারন আর কিছুই নয় তার জন্মস্থান।

গোয়াল ঘরে জন্ম সোমের।  গোয়ালঘর না বলে ছাগলঘর বলা ভাল।  গ্রামের চারপাশে বেশ কয়েকটা বড় পুকুর আছে। এখন কি অবস্থায় সোমের জানা নেই।  বহুদিন পা রাখে নি সে ওপ্রান্তে, যদিও মনটা প্রায়ই হারিয়ে যায় সেই ধোঁয়া তোলা কু-ঝিক-ঝিক ট্রেনের আওয়াজে।  হারিয়ে যায় সেই কোন মেঠো পথ ধরে মামাবাড়ি আসা।  মাঝপথের ক্রমশ পাতলা হয়ে আসা নদীর জল।  ভরা বর্ষায় যদিও তার সবল রুপের সাথে পরিচয় সোমের আছে।  আরোও এক অদ্ভুত প্রকৃতি লক্ষ করেছে সে পুরো গ্রামটাই ধুলোয় ভরা।  যেমন দেখা যায় নদীর ধারে।  হয়তবা কোনোও এক সময় বয়ে যেত জঙ্গলের মাঝেই সেই নদী যা এখন ক্রমশ ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে গ্রামের বাইরে স্থান করে নিয়েছে।  এতো গেল গ্রামের প্রকৃতি।  এছাড়াও ছিল পাখি শিকার।  গুলি খেলা।  পুকুরে স্নান।  এসব স্মৃতির ফাঁকে সোমের এ-কদিন পেয়ে বসেছে ধম্মপূজোয়।  কেনই বা বুদ্ধ পুর্ণিমার দিনে ধম্মপূজো একথার ব্যাখ্যা নেই। 

বুদ্ধ আর ধম্ম তো ওতোপ্রতোভাবে জড়িত।  তাহলে রাঢ় বাঙলাতেও এই সুদুর জঙ্গলে ঘেরা গ্রামে বুদ্ধের প্রচার এসে পৌঁছেছিল! 

গ্রামের বহু পুরোনো দূর্গা মন্দিরের বয়স জানা নেই।  মন্দিরের বাইরে ও ভিতরের কাজ কাজ সে যুগের অনেক ভাল হাতের কারিগরের পরিচয় দেয়।  সোম ঠিক করে - এবার তো হলো না পরের বার যাবে।  অনেক কিছুই তো জানা নেই বোঝা নেই।  গুগুল খুলে বসে কাশীপুরের রাজার এস্টেটের ইতিহাস জানতে।

আপনাদের কাছে কোনোও খবর আছে কি?? প্লিজ শেয়ার করবেন।

                                                (২)

মেলা শব্দ আমাদের কাছে অতি পরিচিত।  রকমারি আবেগ জড়িয়ে থাকে ছোটবড় সকলেরই।  অলীক গেছিল দিন দুয়েক আগে হঠাৎই ঘুরতে-ঘুরতে এক মেলায়, সাথে ছেলে।  নানান হাতের কাজের ভান্ডার।  তারই একপাশে ছোট্ট একটা জায়গা ঘিরে বোটিং করার ব্যাবস্থা - পঞ্চাশ টাকা প্রতি দশ মিনিট। টাকার নিরিখে হয়ত বা সার্ভিস একটুবা কমই, কিন্তু কিইবা করা!  যস্মিন দেশে যদাচার! 

ছেলের আনন্দ অলীককেও আনন্দে নিয়ে যায়।  কোন বাপ-মা না ছেলের আনন্দে আনন্দিত না হয় - সে ছেলে বড় হলে যা খুশি ভাবতেই পারে।  অলীকের আনন্দের মাঝেও নজর কাড়ে দুটি ফুলের মত শিশু।  বেশ উৎসুক হয়ে অপেক্ষায় রয়েছে বোটিং করবে বলে।  বাচ্চাদের আনন্দের ছাপ বড়দেরও শিশু বানিয়ে দেয় সেকথা অলীক বোঝে।  শুধু অলীক নয় সব বাপ-মা শিশু হয়ে যায়।

পাশ থেকে একটি মন্তব্য অলীককে টানে।  বাচ্চাটির মা অনুরোধ জুড়েছে ব্যাবসায়ীর কাছে - দুটি বাচ্চার জন্য কিছু কম টাকা নিন। 

ব্যাবসায়ী অনড়।  ব্যাবসার জায়গায় সে তো কাউকেই ছাড়ে না।  সেটাই ব্যাবসার ধর্ম! 

বাচ্চাদুটির মা’র করুণ মুখ ও বাপির অপারগতা তাকে তার পুরোনো দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।  অলীকের বাপির অবস্থা একসময় বেশ খারাপই হয়েছিল।  কারন বোঝার বয়স তখনও হয় নি।  বাপির অসুখ তার মাস মাইনের ওপর ছাপ ফেলেছিল।  মাসের শেষে টানাটানির সংসার।  তারই মাঝে অলীক জিদ ধরে সার্কাস দেখতে যাবার বন্ধুদের সাথে।  বাপির মানা।  বন্ধুর বাপির দয়ার দানে সার্কাস দেখা।  শেষ পরিনতি বাপির প্রহার।  এখন বোঝে তার মাঝে লুকিয়ে থাকা বাপির অপারগতা।  

ঘোর কাটে অলীকের।  ইশারায় মেনে নিতে বলে ব্যাবসায়ীকে।  তার ধর্ম বাচ্চাদুটির খুশি।  তাদের আনন্দ।  বিনিময় মূল্য তিরিশ টাকা!  গোপনে, অহংকারে ঠেস না দিয়ে।  বাচ্চাদুটির বোটিং, তাদের সাথে নিজের ছেলের খেলা ভাল লাগে অলীকের, ভীষণ ভাল লাগে।  ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়, প্রার্থনা করে এই ধর্ম পালনের ক্ষমতা দেবার জন্য।  

                                                     (৩) 

পরদিন সকালে অলীক অফিস গেছে। সব কাজও করেছে আনন্দের সাথে। তারই ফাঁকে শেয়ার বাজার থেকে প্রায় হাজার তিরিশেক প্রফিট করেছে!!! 

  

Popular Posts