ব্যাখ্যা নেই

 একসময় কাজের তাগিদে প্রায়ই ফ্লাইটে ডেইলি-প্যাসেঞ্জারী করতে হতো।  সেসময় ভীষন ব্যাস্ত হওয়ার কারনে অনেক কিছুই মিস করে ফেলেছি।  আমার প্রিয় এক লেখকের ভাষায়- অতিরিক্ত কাজের চাপে জীবনের সৌন্দর্য দেখার সুযোগ হারিয়ে ফেলি আমরা। 

হ্যাঁ, ঠিক তাই।  আজ এই রিটায়ার্ড লাইফে এসে লেখার তাগিদে বুঝি এই কাজটা অনেক আগেই করা উচিৎ ছিল, করা হয়নি।  সে যাই হোক, আভি নেহি তো কভি নেহি এই মনোভাব নিয়েই আমার লেখার পথের যাত্রা শুরু।  আজকের ঘটনা একটি পুতুল-পুতুল মেয়ের।    

সে এক অন্য জীবনের কথা।  এখনের মত নিশ্চিত সময় অপচয়ের বিলাস তখন ছিল না।  ভোর হলে কোন নতুন শহরে যাওয়ার পালা।  কখনও একই রাত্তিরে ফেরা কখনও বা দিনকয়েক পর।  আমার রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সে থাকত একটি পুতুল পুতুল চেহারার মেয়ে- পেশায় ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস।  অর্থে ফ্লাইটে লোকজনের প্রয়োজনের প্রতি নজর রাখা কাজ।  সঠিক সময় সঠিক চাহিদা মেটানোর ওপরেই এই পেশার উন্নতি নির্ভর করে।  শুধু তাই নয় সব কিছুই করতে হবে হাসিমুখে।  গোমড়ামুখো হওয়া মানা।  সে যাইহোক মাঝেমাঝে মেয়েটির সাথে ফ্লাইটে চোখাচোখি হতো, মিষ্টি হেসে এগিয়ে দিত প্রয়োজনীয় জল, কফি, ও ব্রেকফাস্ট।  অথচ কমপ্লেক্স-এর চত্তরে কোনোওদিনই দেখতে পায়নি আড্ডা দিতে, দেখা হলেও গোমড়ামুখো হয়েই পেরিয়ে যেত যেন নিজের জগৎ নিয়েই ব্যাস্ত।  আমার মত সেও ছিল এয়ারপোর্ট-এর নিয়মিত যাত্রি।  তফাৎ শুধু একটাই আমি প্রিভিলেজ্ড কাস্টমার ও সে প্রিভিলেজ্ড সার্ভিস প্রভাইডার।  প্রিভিলেজ্ড সার্ভিস প্রোভাইডার বলার কারন একটাই তৎকালীন সময় এই চাকরির গ্জড়িয়ে থাকা গ্ল্যামার!  আসলে আমরা সকলেই সৌন্দর্যের পুজারী ও এই চাকরিতে সুন্দরী যুবতী ছাড়া দরজা খুলত না।  অবশ্য এখন সবই বদলে গেছে।  সস্তার এয়ারলাইন্স সস্তার সার্ভিস; সবই সস্তার।  এয়ার সার্ভিস তার কৌলীন্য অনেকটাই হারাতে বসেছে।  যদিও তা সামাজিক দিকে ভালই।  থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট-টিশার্ট-স্লিপার এই কম্বিনেশানের প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইন ব্যাবসার মর্যাদা না কমালেও প্যাসেঞ্জারের ভীতি কমিয়েছে।

সে যাই হোক ফিরে আসি সেই রাতের কথায়।  বৃষ্টির রাত, সবে এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছি।  সকলেই যাবার তাড়া নিয়ে নামতে ব্যাস্ত, আমিও।  বাড়িতে বৌ-মেয়ের মুখ দেখার আকুলতা।  কোম্পানির দৌলতে গাড়ি ও ড্রাইভার ফ্রি।  কাজেই আমার ব্যাস্ততা থাকলেও চিন্তা নেই।  তার ওপর বিজনেস ক্লাসের টিকিট হওয়ার কারনে একটু আগেই নামার সৌভাগ্য সবসময় হয়, প্রিভিলেজ্ড।  প্রিভিলেজ্ড হওয়ার মজা একটাই নিজের মধ্যে অহংকার ডেভেলপড করা।  আমিও তার ব্যাতিক্রম নই।  এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে চেপে গম্ভীর হওয়া আমার নেচার হলেও সেদিন আমি একটু অন্যমনষ্কই ছিলাম।  মেয়ের সকালে জ্বর দেখে বেরিয়েছিলাম, শরীর বেশ কিছুদিন ধরে খারাপ, কিন্তু কাজের চাপ আমায় বাধ্য করছে ট্রাভেল করতে।  হঠাৎই নজরে পড়ে সেই পুতুল-পুতুল মেয়েটি বাইরে দাড়িয়ে, চোখ-মুখ থমথমে।  আবদুল, মানে আমার ড্রাইভারকে গাড়ি দাড় করাতে বলি।  গাড়ির কাঁচ সরিয়ে প্রশ্ন করি, বাড়ি যাবে?

হাসি মুখে গাড়িতে এসে বসে মেয়েটি।  গায়ে সেই সুন্দর এয়ার হোস্টেসের গন্ধ।  নিজেকে মেইনটেইন রাখা এদের ডিউটির মধ্যেই পড়ে।  খুব সরলভাবে মেয়েটি বলে, আঙ্ক্ল আমি আপনার মেয়ের বন্ধুর বোন।

ওহ, তুমি তুলিকে চেনো?

হ্যাঁ।  বেশ মিষ্টি মেয়ে।

তুমিও তো মিষ্টি।  আমি পাল্টা জবাব দিই।

লজ্জা পেয়ে যায় মেয়েটি।

তোমার নাম কি?  আমি লজ্জা ভাঙানোর জন্য প্রশ্ন করি।

মোনা।  অবশ্য সবাই বলে মুনা।

কেন?

মেয়েটি হেসে বলে, আমার বাপি বলত চাঁদমুখপানা মেয়ে।  তাই আমি ডাকব মুনা।  মোনালিসার থেকে ধার নেওয়া মোনা আর তারই থেকে মুনা।

একথা সেকথা শেষে হাউসিং এসে পড়ে।  বৃষ্টি অঝোরে না হলেও পড়ছিল।  আমি আবদুলকে বলি ওদের অ্যাপার্টমেন্ট-এর সামনে ছেড়ে দিতে।

মেয়েটি বেশ সুন্দর স্মাইল দিয়ে বলে, বাই আঙ্কল।  বেশ সুন্দর আধুনিক নারীর প্রগতিশীলতার ছাপ রয়েছে মেয়েটির মধ্যে।    

বাড়িতে ঢুকে মেয়ের সাথে গল্প করে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে সবাই ডিনারে বসি।  ডিনার টেবিলে রমলা মানে আমার স্ত্রী বলে, তুলির বন্ধুর দিদি মানে তোমার সেই পুতুল-পুতুল মেয়েটির কান্ড বলিহারি - কোথায় কোন ছেলের সাথে রিলেশানসিপ-এ জড়িয়ে পড়েছিল।  সে বোধহয় ডিচ করেছে।  তাই তোমার সুন্দরী সুশীলা পুতুল-পুতুল মেয়ে স্লিপিং পিল খেয়ে হসপিটালে ভর্ত্তি হয়েছিল। 

আমি খানিক অবাক হয়ে রমলার দিকে তাকাই।  তা কিকরে সম্ভব!  একটু আগেই তো গাড়িতে করে একসাথে এলাম।  রুটির টুকরো মুখে নিতে নিতেই বিষ দৃষ্টি ভেসে এল চোখের সামনে মনে হলো মেয়েটি আর বেঁচে নেই।  কিছু না বলে খাওয়ায় মন দিই।

কথা না বাড়ানোয় রমলা চুপ করে যায়।  রাত্তিরে বেডরুমে ত্বকচর্চা করতে করতে বলে, মেয়েটি আর বেঁচে নেই।  আহারে!!  ঠিক পুতুল-পুতুল ছিল মেয়েটি।  বাড়ির অবস্থাটা খারাপ হলো এসময়।  বোনটি পড়ে তুলির সাথে, বাবা মারা গেছেন তিন বছর, আর মা'র স্ট্রোক হয়েছিল গতবছর।  কিকরে যে এসব কাজ করে এসব মেয়ে!  খানিক ব্যাকুলতা থেকেই রমলা অভিযোগের সুর আনে।

রমলার কথা আমায় আর টানেনি।  আমার মাথায় তখন ঘুরছে অন্য কথা - মারা যাওয়ার পরদিন মেয়েটিকে নিয়ে এলাম একসাথে।  তাও এয়ারপোর্টের টাটকা জলজ্যান্ত স্মৃতি !  অনেক ঘুরেছি জীবনে, বহু ঘটনার সাক্ষী থেকেছি জীবনে, কিন্তু এরকম ঘটনার সাক্ষী কখনও থাকিনি আর এবং এর ব্যাখ্যাও কখনও পাইনি।   

Popular Posts