প্রেম



 বসন্তের বিকেল।  ফাঁকা কালো পিচের রাস্তা, দুধারে শুকনো-রুক্ষ মাঠ।  মাঝে বালি সল্প জলের প্রবাহ জায়গাটায় প্রানের ছোঁয়া দিয়েছে।  আসলে রুক্ষতার মাঝে জলের আয়োজন জায়গাটাকে পরিপূর্ণ করেছে।  তারই মাঝে কয়েকটি উঁচু টিলা  একটি মন্দির।  দেখে মনে হয় শশ্মান।  মন্দিরের পাশ দিয়ে একফালি পায়ে হাঁটা রাস্তা ঢালু হয়ে নেমেছে নিচে।  জলের মাঝে একটি টিলা একলা দাড়িয়ে।  পাথরগুলি নিকশ কালো, বড়।  তারই মাঝে কৌতুহল জাগায় এক যুবক।  জনশূন্য টিলার মাথায় চুপ করে বসে।  পরনে নীল জিনস্ পিঙ্ক টি-শার্ট।  দূর থেকে দেখেও সচ্ছলতা অনুভব করা যায়, কিন্তু কোথাও একটা বিচ্ছিন্নতা লুকিয়ে আছে।  চলুন একটু এগিয়ে দেখা যাক।  আরে হঠাৎ একটি দশ-বারো বয়সের বাচ্চা দেখা যায় টিলার ওপর উঠছে।  যুবকের দৃষ্টি স্থির জলের স্রোতের দিকে।  বাচ্চাটি পিছন থেকে চিৎকার করতেই চমকে ওঠে যুবক।  খানিক চুপ থেকে প্রশ্ন করে - বাড়ি কোথায়?
পাল্টা প্রশ্ন ফিরে আসে, তোমার নাম?
পলাশ, জবাব দেয় যুবক।
বাচ্চাটি দূরের দিকে আঙুল তুলে দেখায় বাড়ি।  পলাশ বিচ্ছিন্নতা মুছে বাচ্চাটিকে নিয়ে টিলা থেকে নেমে রাস্তার দিকে পা বাড়ায়।
রাত্রি শুরু হয়েছে।  ব্যাঙ্গালোর শহরটি ভারী সুন্দর।  সাজানো-গোছানো বাগানের মত।  কলেজ হস্টেলটিও ভারী সুন্দর জায়গায়।  আসলে রাত্রি আরোও সুন্দর হয়েছে সকলের আকাশের প্রতি ভালোবাসায়।  আকাশ ল-স্কুলের ফাইনাল-ইয়ার স্টুডেন্ট।  রেজাল্ট বেরোনোর আগেই ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ দিয়ে একটি বড় এম।এন।সি-তে জয়েন করেছে, এবং বাইরে যাওয়াও পাকা।  সকলের উল্লাসের মাঝে শান্ত আকাশ ডাইরি লিখতে বসে।  সামনের জানালার থেকে একফালি চাঁদের শোভা ঠিকরে আসছে আকাশের গায়ে।  এই আনন্দের মুহূর্তেও এক ব্যাথা কাজ করে আকাশের বুকে।  দাদার কথা ভাবলেই কষ্ট হয়।  সাথে এসে পড়ে ইতুদি।  মনে পড়ে ছেলেবেলার কথা - দাদা বরাবরই চুপচাপ, ইতুদি খুব ছট্পটে।  ওর সাথে খুব ভাব ছিল।  সবসময় দাদার পিছনে লেগে থাকত।  আর প্রয়োজন হলেই তাকে বলত - ভাই, দাদাকে এটা বল্ না, ওটা বল্ না।  খুব আনন্দ পেত আকাশ।  দেখেছিল দাদা একমাত্র ইতুদির সামনেই একটু খোলামেলা হোত।  লুকিয়ে দেখেছি চোখে আনন্দের ঝিলিক বয়ে যেত।  বাবার অকাল মৃত্যু দাদাকে অনেক বড় করে দিয়েছিল।  অথচ মা ইতুদিকে সহ্য করতে পারত না।  খালি বলত - পলাশের যোগ্য নয়।  একদিন এল সেই অমোঘ সময় - ইতুদি দাদার কাছ থেকে সরে গেল।  কর্তব্যের তাগিদে দাদা "না" বলেছিল।  যখন ল-স্কুলে পড়ার জন্য ট্রেন-এ তুলতে আসে দাদা, বলেছিল - ভাইরে নিজের জীবন দিলাম, মান রাখিস।  সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম দুটো- একটাতো হোল।  আরেকটা নিজের কাছে করা।  দাদার চোখে আনন্দের ঝিলিক।  দাদার জীবন!  ইতুদিকে ফিরিয়ে দিতেই হবে।  এখনতো মা-ও নেই ….. 
রাত্রি দশটা।  বাচ্চাটি ও ভদ্রমহিলাকে বিদায় জানিয়ে পলাশ বাড়ির 
পথে পা বাড়ায়।  বাচ্চাটি কাল আবার আসার আবদার জানিয়েছে।  জোৎস্না ঘেরা ফাঁকা রাস্তায় বেশ ভার হাল্কা হয়েই হাঁটছে।  এক আনন্দের আবেশ ঘিরে আছে পলাশের শরীরে।  অদ্ভূত শিহরণ।  ভদ্রমহিলার প্রাণশক্তি অতুলনীয়।  স্বামী ছাড়া তিন বছর এই ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে কাটানো!  তাও শান্ত-সমাহিত রুপে!  অনেকদিনবাদে ইতুর কথা মনে পড়ছে।  কোথায় আছে?  কেমন আছে?  কে জানে!  তার প্রেম কি আবার জেগে উঠল?
এইসব ভাবতে-ভাবতে কোয়ার্টার্স-এ এসে পৌঁছয়।  হঠাৎ এই শহরে বদলি হয়ে আসা, হঠাৎ প্রেমের জেগে ওঠা।  বিছানায় শুয়ে ভাই-এর কথা মনে পড়ে।  ফোন তুলে ডায়াল করার আগেই রিং বেজে ওঠে।  গলার আওয়াজ শুনে খুব খুশি - আকাশ।  কাল আসছে, ছুটি নিতে বলেছে কয়েকদিনের।  ওর কি একটা কাজ নাকি সম্পূর্ণ করার আছে।  লাইট-টা অফ্ করে পাশ ফিরে ইতুর কথা ভাবতে-ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়ে পলাশ।

Comments

Popular Posts