শেষ সুতোর টুকরো


 দেবাশিস্  ভট্টাচার্য্য 


বাঙালি পাড়া।  তারই মাঝে থাকেন রোজি ডিমেলিও।  বয়স প্রায় সত্তর ছঁুই ছঁুই।  গায়ের রং এখন লালচে থেকে তামাটে হয়ে আসছে।  বয়সের যা ধর্ম।  স্বামী মারা যাবার পর অনেকটাই একলা হয়ে গেছেন।  একমাত্র মেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়।  বছরে একবার আসে।  তারই আনন্দ নিয়ে কাটে গোটা বছরটা।  স্বামীর ছিল কাঠের ব্যাবসা।  মারা যাবার পর রোজি লিজে দিয়েছে তারই এক কর্মচারীকে।  এতে ব্যাবসাটাও থাকল, কর্মচারীরাও বঁাচল।  বুদ্ধিটা অবশ্য মেয়েরই।

আজ ভোর হতেই রোজি বেরিয়েছে ফোন করতে।  বাড়িতে ফোন থাকা স্বত্তেও প্রায় কিলোমিটার খানেক পথ পেরিয়ে ফোন করতে আসাটা রোজির অভ্যাস।  আসলে এতে রোজির মর্নিং-ওয়াকটাও হয়, আর পুরোনো বন্ধু ড্যানিয়েল-এর সাথে আলাপটাও।  ড্যানিয়েল একসময় চাকরি করত একটি বিলীতি ফার্মে।  এখন রিটায়ার্ড।  রোজির মনে পড়ে যায় ড্যানিয়েলের সাথে প্রথম আলাপ-পর্ব।

তখন হকি খেলার খুব চল ছিল।  আলফ্রেড মানে রোজির
হাজবেন্ড হকিটা খেলতও ভাল।  জুনিয়র ইন্ডিয়া রিপ্রেজেন্ট করেছিল।  ময়দানে খেলা থাকলে রোজি প্রায়ই দেখতে যেত।  আসলে সে মাঠে থাকলে আলফ্রেড নাকি বেশ চার্জ্ড ফিল করত।  একদিন খেলার শেষে লাল টকটকে, পাতলা ছিপ্ছিপে, ভাসা-ভাসা চোখের একটি ছেলেকে এনে আলাপ করিয়ে দেয়, বলে - মিট্ ড্যানিয়েল।  মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।
                    
                           রোজি আলফ্রেড-এর পরিচয় করানোর ধরণে বেশ লজ্জা পেয়েছিল।  ওকে সবাই ডাকত 'আলফ্রি' বলে।  ও ছিল বেশ ডাকাবুকো।  কোনোও ভয়ই কাজ করত না ওর মধ্যে।  একদিন তো সরাসরি বাপিকে বলেই দিল - আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইয়োর  ডটার।

বাবা ছিলেন রাশভারী প্রকৃতির।  ঘরে ফিরে রাত্তিরে ডাইনিং টেবিলে বসে প্রথম প্রশ্ন - ডু ইউ লাইক আলফ্রি?

ঘাড় নিচু করে সায় দিই কথাটাই।  পরে বুঝি বাপি-মার সায় 
ছিল সম্পর্কটাতে।  বাপির পুরো নজর ছিল আমার গতিবিধির দিকে।  আমি যে আলফ্রির খেলা দেখতে যেতাম বাপি তা জানতেন।

তারপরই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা।  আলফ্রি হঠাৎ খেলা ছেড়ে দিল। সবাই খুব অবাক হয়েছিল।  কাউকে কিছু না বলেই সিদ্ধান্ত।  রোজিতো রাগ করে তিনদিন কথাই বলে নি।  যার ইন্ডিয়া রিপ্রেজেন্ট করার কথা সেকিনা ……!

শেষপর্যন্ত ড্যানিয়েল-এর মধ্যস্থতায় আবার কথা শুরু। অনেক পরে কারণটা জেনেছিল। ওদের কোচ নাকি একদিন রোজির সম্পর্কে আলপট্কা মন্তব্য করেছিল।  তারই জেরে খেলা ছাড়া।  রোজি শুনে বেশ অবাক হয়েছিল, আবার চোরা আনন্দও অনুভব করেছিল।  সেদিন রোজি বোঝে তার সাহসী আলফ্রি আদপে একটি বাচ্চা ছেলে যে সব কিছুই নিজের মত করে চায়।

খেলা ছাড়ার পরেই আলফ্রির মধ্যে পরিবর্তনগুলো দেখা দিল।  খেলা ও রোজি - এই দুই ছিল আলফ্রির জীবন।  একটা যেতেই অন্যটা আরোও বেশি করে আঁকড়ে ধরে।  রোজিকে তখন অনেকটাই সময় দিতে হতো আলফ্রির জন্য।  বাপি কিন্তু আলফ্রির কাজ-কারবার দেখে বেশ বিরক্তই হচ্ছিলেন।  বাধ্য হয়েই ড্যানিয়েলকে ধরলাম।  ড্যানিয়েল তখন সবে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া লিমিটেড কোম্পানীতে ট্রেণি।

সব শুনে ও বলে - লেট্ মি টক টু হিম।

ভরসা পেলাম ওর কথা শুনে।

কয়েক সপ্তাহবাদে একদিন সন্ধেবেলা আলফ্রি আর আমি আমাদের গেটের বাইরে দাড়িয়ে গল্প করছি, দেখি ড্যানিয়েল হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত।  প্রায় হঁাপাতে-হঁাপাতে বলে - এক্ষুনি যেতে হবে।  মিঃ অ্যাট্কিনসন্ ডেকেছেন।  উনি ফ্যাকট্রি ম্যানেজার। 

ওরা দুজনে চলে যায়।  আমিও বাড়ির ভিতর পা বাড়াই।  রাত্রিবেলা তখন প্রায় -টা হবে, আলফ্রি রোজি রোজি করে ডাক পাড়ে।  বেরিয়ে এসে দেখি সাথে ড্যানিয়েল - দুজনে দাঁড়িয়ে।  আলফ্রিকে দেখে বেশ উত্তেজিত মনে হয়।  ভাবলাম চাকরিটা হলো তবে।

সামনে যেতেই আলফ্রি বলে - একটা কাজের ব্যাবস্থা হলো।  চাকরি নয়, কোম্পানীতে প্রথম স্টেশনারী সাপ্লাই।  কথাটা শুনে অত আনন্দ না হলেও আলফ্রির দিকে তাকিয়ে উৎসাহিত হই

                            বাপিকে রাত্তিরে কথাটা পাড়তেই বেশ খুশি।  আনন্দে বলেই ফ্যালেন - যাক এবার ছেলেটা দাড়িয়ে যাবে

সেই শুরু।  ধীরে-ধীরে আলফ্রি ব্যাবসায় মন দেয়।  কমতে থাকে তার প্রতি মনোযোগ, বাড়তে থাকে টাকার প্রতি প্রীতি।  রোজি মাঝে-মধ্যে বেশ ভয়ই পেত আলফ্রির ব্যাবহারে।  একদিনতো চারটের সময় মারকর্েটিং-এ যাবার কথা এল আটটায়।  রোজি চারঘন্টা ধরে অপেক্ষা করেছে।  ঘরে আসতেই একপ্রস্থ ঝগড়া।  সেই ছিল শেষ, আর কখনও লেট করে নি।

একদিন  হঠাৎ আলফ্রির বাবা-মা এসে হাজির।  ওরা থাকতেন নর্থ বেঙ্গলে-এ।  আলফ্রির বাবা কাজ করতেন রেল-এ।  ওরা এবার আলফ্রির বিয়ে দিতে চান।  আলফ্রিই নিয়ে এসেছে।  দেখতে-দেখতে সময় ঘনিয়ে আসে বিয়ের।  বিয়েটাও হয়, তবে নর্থ বেঙ্গলে।  বিয়েতে কলকাতা থেকে হাজির ছিল একমাত্র ড্যানিয়েল।

নর্থ বেঙ্গল-এ প্রায় বছর তিনেক ছিল রোজি।  বেশ ফঁাকা-ফঁাকা লাগত।  ট্রামও নেই, বাসও কম।  দুধারে খালি বড় ঘন 
জঙ্গল।  মাঝে কালো পিচের রাস্তা।  বিকেলবেলা হঁাটতে অসাধারণ লাগত।  তবে মনটা খারাপ হতো সন্ধের পর।  আসলে সন্ধে থেকেই মনে মনে কামনা করত আলফ্রির সঙ্গ।  তখনতো ফোন এত হয় নি।  কাজেই এত দ্রুত যোগাযোগ করা যেত না।  আলফ্রির কোটা ছিল মাসে একবার, দিন তিন-চার-এর জন্য।  এখনতো রোজি ভেবে অবাক হয়, মেয়ে থাকে অস্ট্রেলিয়ায় অথচ রোজ ফোনে যোগাযোগ।  সত্যি যোগাযোগ ব্যাবস্থায় অনেক উন্নতি হয়েছে।

                       গতবছর লিজা অস্ট্রেলিয়া থেকে এসে ওর ই-মেল আকাউন্ট খুলে দিয়ে যায়।  রোজির সেকি ভয়।  কখনও কম্পিউটার ধরে নি, সে কিনা করবে মেইল চেক।  শেষপর্যন্ত উদ্ধারকর্ত্তা সেই ড্যানিয়েল।  ঐ পাখিপড়ার মত করে শেখায়।  এখন সকাল হলেই দুটো কাজ - এক, ফোন করা; দুই - মেইল চেক।

লিজার ছেলেটা ভারী ছট্পটে।  অস্ট্রেলিয়া থেকে বেশ সুন্দর-সুন্দর জোকস্ পাঠায়।  ভাল জোকস্ পেলে রোজি আবার প্রিন্টও নেয়।  ড্যানিয়েল সেইসব দেখে খুব হাসে আর বলে - শেষে নাতির জন্য বুড়ো বয়সে নেট-স্যাভি হলো রোজি। 

রোজি কপট রাগ দেখায় ড্যানিয়েল-এর ওপর।  মনে মনে ফিরে যায় সেই দিনগুলোয়।  যখন রোজি, আলফ্রি আর ড্যানিয়েল খুব আড্ডা মারত।  সত্যিই কি আনন্দেরই না ছিল সেই দিনগুলো।  ড্যানিয়েলের ছিল পাহাড়ে বেড়ানোর নেশা।  বহু জায়গায় ঘুরত আর ফিরে এসে নানারকম গল্প জুড়ত।

বিয়ের তিন বছর বাদে ওরা সবাই নর্থ বেঙ্গ্ল ছেড়ে চলে আসে।  আলফ্রি তখন বড় ফ্ল্যাট নিয়েছে।  সাপ্লাই-এর ব্যাবসা ছেড়ে বড় একটা কাঠের মিল কিনেছে।  নর্থ বেঙ্গল থেকে ট্রাক বোঝাই করে কাঠ আসে আর এখানে চেরাই হয়ে চলে যায় বিভিন্ন জায়গায়।  রোজি মাঝে-মধ্যেই আসত কারখানাতে।  বড় বড় কাঠের লগগুলো দেখে ওর নর্থ-বেঙ্গলের দিনগুলো মনে পড়ত।  মনে হতো গাছগুলো কঁাদছে আর আমরা জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ করে চলেছি।  অনেক চেষ্টা করলেও আলফ্রিকে ব্যাবসা পরিবর্তনের কথা কখনও বলতে পারে নি।  পরে ব্যাথা পেতে-পেতে কারখানায় যাওয়া বন্ধ করে দেয়। 

বছর দুয়েকের মধ্যে মেয়ে লিজার আগমন।  আলফ্রির তখন আনন্দ আর ধরে না।  কি করবে খঁুজে পেত না।  মাঝে তো কারখানাতে যাওয়ায় কমিয়ে দিল।  ঐ সময় লিজা-শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে কেটে যেত বেশ।  উপরি পাওনা বাপি-মা।  ভীষণ আনন্দ হতো ড্যানিয়েল এলে।  বুঝতে পারতাম ড্যানিয়েলের ওপর এবাড়ির একটা সফট্ কর্ণার তৈরি হয়ে গেছে।  সকলে একসাথে হলেই চেপে ধরত ড্যানিয়েলকে বিয়ের ব্যাপারে।  আর ড্যানিয়েল লাজুক মুখে পাশ কাটিয়ে যেত।     

অনেক বছর পর লিজা তখন বড় - একদিন হঠাৎ ড্যানিয়েলকে প্রশ্ন করে বসে, " আঙ্ক্ল, হোয়াই ডিডন্'ট ইউ ম্যারি?" 

ড্যানিয়েল হোঃ হোঃ করে হেসে সকলের সামনেই যে জবাবটা দেয় তাতে রোজি লজ্জা পেয়ে যায়।  কে জানে কথাটা হয়ত সত্যি - আলফ্রি না হলে হয়ত ড্যানিয়েলকেই বিয়ে করে ফেলত।

গাড়ির হর্ণ ঘোরটা কাটায়।  খেয়ালই করেনি কখন ড্যানিয়েলের বুথের সামনে এসেছে।  বিল্ডিং-টার সামনে জটলা দেখে অবাক হয়।  চোখে পড়ে শববাহী গাড়ি।  বুকটা কেমন হঁাকপাক করতে থাকে।  খানিক দাড়ায় রোজি।  বুকে বল নিয়ে জটলার দিকে এগোনোর চেষ্টা করে।  

মনের কোনে অজস্র প্রশ্ন উঁকি মারে।  তাহলে কি ড্যানিয়েলের সাথে আর দেখা হবে না।  সারা শরীরটা ঝিম্ঝিম করে, গা গুলোচ্ছে।  আজ আবার লিজার ছেলে স্যান্ডির জন্মদিন।  রোজির মাথা আর কাজ করছে না।  হঠাৎ কানে আসে - ওপর থেকে বডিটা নিয়ে আসতে হবে।  রোজি নিঃসংশয় হয় কথাটাতে।  কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে তাও পারছে না।  বাক্-শক্তিটাই নেই।  কাঁধের ওপর টোকাটায় সম্বিত ফেরে।  পেছনে তাকিয়ে দেখে ড্যানিয়েল মিটিমিটি হাসছে।

রোজি আর কালক্ষেপ না করে বুথ-এর দিকে এগোয়।  যেতে-যেতেই প্রশ্ন করে অজস্র।  কে মারা গেছে? কখন? কত বয়স হয়েছিল?

সব কিছু জেনে মনটা খারাপ হয়।  ড্যানিয়েল-এর পাশের ফ্ল্যাটে দুর্ঘটনাটা ঘটেছে।  বেশি বয়স নয়।  মাত্র পঁয়তাল্লিশ।  স্ট্রোক হয়েছিল মাঝরাতে।

এরপর প্রায় ঘন্টাখানেক কাটায় ড্যানিয়েলের বুথে।  স্যান্ডিকে বার্থ-ডে উইশ করে।  অনেকক্ষন গল্পও করে সবার সাথে।  ড্যানিয়েল চা আনিয়েছিল - তাও খেয়েছে।  

ফেরার সময় পথে হঁাটতে-হঁাটতে এক বোধ কাজ করে - সত্যিই যদি ড্যানিয়েল মারা যেত।  এই প্রথম ড্যানিয়েল-এর প্রতি নিখাদ ভালবাসা অনুভব করে।  হঁাটতে-হঁাটতেই একবার প্রার্থনাটা সেরে নেয় - হে ঈশ্বর, ড্যানিয়েল-এর আগেই আমাকে তুলে নিও।  উপলব্ধি হয়, এই ড্যানিয়েলই তার শেষ প্রাণশক্তি।  তার সম্পর্কের শেষ সুতোর টুকরো।     

Comments

Popular Posts