তিতলি

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য্য

তিতলি – নামটা শুনলেই মনে হয় একটা ছটপটে বাচ্চা মেয়ের ছবি।  কিন্তু না ইনি বাচ্চা নন – রীতিমত যুবতী, প্রখর ব্যক্তিত্বময়ী, শান্ত, চুপচাপ।  নিজের কাজ ছাড়া বাকি আর কিছুই জানে না।  দেখছিতো আমি ছোটো থেকে – সেই ছটপটে, দুষ্টু, বাচ্চা মেয়েটি হঠাত বদলে গেল।  আসলে একটা ঘটনা সবকিছু নাড়িয়ে দিয়ে গেল। আমার মাঝেমাঝে মনে হয়, সত্তাটা মারা গেলে সত্যের আসাটা বড় জরুরি হয়ে পড়ে।  আসলে সত্যই একমাত্র পারে মৃত গাছটাকে উপড়ে ফেলে নতূন বীজ বুনে দিতে।  আমার কোনও ইচ্ছে নেই তিতলির অতীত নিয়ে নাড়াচাড়া করার, তাই সামনের দিকেই তাকিয়ে আছি।
গরমের দুপুর, রাসবিহারী মোড়।  লোকজন আছে, কিন্তু অল্প।  বহুতলের ওপর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বেশ কিছু পোকা ক্রমাগত চলেছে।  একটি অটোরিক্সা হঠাত এসে দাঁড়ায়।  তিতলি পরণে জিনস্‌ ও আকাশী রং-এর ছোটো কাট্‌-এর পাঞ্জাবী, অটোরিক্সা থেকে নেমে দ্রুত এগোয় মেট্রো স্টেশন-এর দিকে।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে রয়েছে।  আপ ও ডাউন দুদিক থেকেই মেট্রো আসার প্রায় সময় হয়ে এসেছে।  দমদমগামী মেট্রো টি আসতেই সকলে সচেতন হয়ে ওঠে।  তিতলি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এসে দরজায় ওঠার ঠিক আগে একটি হাত এসে পাঞ্জাবীটা টেনে ধরে।  তিতলি ঘুরে তাকাতেই অবাক হয় – জয়।  এত......দিন......বাদে।  ধীরে ট্রেণ ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
বহুদিন বাদে দুজনার দেখা।  কোনও যোগাযোগ নেই।  দুজনে দাঁড়ায় একটা পিলার-এর গা ঘেঁষে।  আসলে জয় কথা বলছিল, তিতলি শ্রোতার ভূমিকায়।  হঠাত অনির কথা ওঠায় তিতলি একটু অস্বস্তিতে পড়ে যায়।  জয় কিছু একটা বুঝে কথা বদলে দেয়।  এগোতে এগোতে জিজ্ঞেস করে- তুই কোথায় যাবি রে?
-রবীন্দ্রসদন হয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরি।
-আমিও যাব। তোর কোনও আপত্তি ?
তিতলি চোখ বড় করে, মাথা নেড়ে, ঠোঁট উলটিয়ে কোনও আপত্তি না থাকার কথা জানায়।
সকালবেলা ঘুমটা ভাঙল জয়-এর ফোনে।  তিনদিন প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।  আসলে সেদিন জয় সব হিসেব গড়বড় করে দেয়।  একটা কাজ করতে দেয় নি।  কিছুদিন বাদেই একটা পেপার সাবমিট্‌ করতে হবে।  তাই এ-কদিন কেটেছে ঝড়ের বেগে।  আসলে পিএইচডি’র এই মজা।  হঠাত এত চাপ তৈরি হয়ে যায়।  প্রফেসর বোস আবার আরোও বেশি।  বড্ড পারফেকশনিস্ট্‌, কিছুতেই স্যাটিস্‌ফায়েড হন না। 
পাশবালিশটা সরিয়ে তিতলি বাথরুমের দিকে এগোয়।  আজ চরিত্রবিরোধী কাজটা করবে।  অর্থাৎ সকাল সকাল স্নান সেরে চা খাওয়া।  কোনওদিন বারোটার আগে স্নান করার অভ্যাস নেই।  আসলে জয়-এর ফোনটা সব হিসেব ভেঙে দিয়েছে।  ওর সাথে কোথায় যেতে হবে।  কোথায় যে নিয়ে যাবে কে জানে!  যা পাগল! না বললে সোজা এসে উপস্থিত হবে বাড়িতে।  ভয়ই লাগে ওকে।  মুখে কোনও ট্যাক্স নেই।  বন্ধু, কিন্তু বড্ড সোজা।  তিন বছর স্টেটস্‌-এর জীবন কিছুই বদলে দেয় নি।  অবশ্য অনি’র মত ইনট্রোভার্ট, লাজুক দের থেকে অনেক ভাল।  
মুখে ব্রাশটা নিয়ে আয়নায় নিজের শরীরটা, মুখ-চোখ খুঁটিয়ে দেখে।  একটু আগে কত কি যে উল্টোপাল্টা ভাবনা এসেছিল।  আসলে জয়-এর সাথে অদ্ভূত একটা ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে।  ভাবলে খুব শরীরি, নইলে খুবই নিষ্পাপ।  কিন্তু ঠিক করেছি পেছনে তাকাব না, তাই সে প্রসঙ্গ থাক।
শাওয়ারটা খুলে সারা শরীরে জলের ধারা বইয়ে দেয় তিতলি।  আয়নায় তাকিয়ে নিজেই লজ্জ্বা পেয়ে যায়।  চট করে টাওয়েলটা টেনে নেয়।  মনে মনে ভাবে ব্লু জিনস্‌ ও থ্রি-কোয়ার্টার টপটার কথা।  জয়-কে বোল্ড করে দিতে হবে।  তিতলি আসলে নিজের সম্পর্কে খুবই সচেতন।  বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার আগে শরীরটা আরেকবার দেখে নেয়।  মনে পড়ে যায় জয়-কে সেই ক্লাস নাইনে জোর করে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার কথা। 
দূরের রাস্তা দিয়ে বাসটি দ্রুত চলেছে।  দুপাশে গাছের সারি কিছুটা দূরত্ত্ব বজায় রেখে।  দুধারে ধানের ক্ষেত।  ঝকঝকে বাসটি এগিয়ে চলেছে।  তিতলি বসেছে জানালার ধারে, পাশে জয়।  চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে, মুখে বাতাস লাগছে, তবুও বাইরে থেকে মুখ সরাবে না তিতলি।  এই সময় বাইরে তাকিয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করছে।  অনেকদিন বাদে অনির কথা মনে পড়ে।  এভাবে গেলে সবসময় জড়িয়ে রাখত; হয় কথা বলে, নয় শরীরের বিভিন্ন জায়গা স্পর্ষ করে।  মাঝেমাঝে অসভ্যতাও করে বসত।  জয় সেদিক দিয়ে ভদ্র।  অবশ্য তিতলি স্কোপ দেয়নি তাই, নইলে কি হোত বলা মুস্কিল।  তিতলি ঘুরে তাকিয়ে জয়-এর হাতটা কোলে টেনে নেয়।
রাত্রিবেলা ডাইনিং-এ জয় ও নয়নাদেবী বসে।  বাবা খেয়ে উঠে পড়েছেন।  জয়-এর বাবা বরাবরই কেমন একটা বাবা-বাবা যেন।  সবসময় তফাত-এ থাকেন।  জয়-এর যা কিছু সব মায়ের সাথেই।  নয়নাদেবীর ঐ একটাই ছেলে।  বড় আদরের।  অবশ্য প্রয়োজনে কড়াও হয়েছেন।
-মা; হাংসা্‌ যে বলত স্কুলটার কথা সত্যিই অসাধারণ।  অতগুলো ফাইনান্সিয়ালি ব্যাকোয়ার্ড বাচ্চাকে ওভাবে রাখা! নাহ্‌, সিম্পলি সুপার্ব।  শুধু একটারই অভাব বোধ হোল, কোনও একজন সঠিক পরিচালক প্রয়োজন রয়েছে সব কিছু ধরে রাখার জন্য।
নয়নাদেবী এতক্ষন শুধু গালে হাত দিয়ে জয়-কে দেখছিলেন।  মনেপ্রাণে তিনি চাইছিলেন জয় তিতলির কথা তুলুক।  জয় ধরতে পারছে না হাংসা্‌’র স্কুলটা তো ভালই, আরোও ভাল লেগেছে তিতলি পাশে ছিল বলে।  নয়নাদেবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে পড়েন, ভাবেন- উদ্যোগটা তাকেই নিতে হবে।

Popular Posts