পমির দুনিয়া

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য্য
শহরের নাম উল্লেখ না করেই এই গল্পের শুরু। আসলে এটা গল্প না হলেও গল্প আখ্যা দেওয়াটা সুবিধের, অনেক কিছুই অধরা রাখলেও চলে। যাইহোক, বর্ষাকালটা পেরোলেও, বর্ষা পেরোয়নি। মাঝেমধ্যেই তার শ্রী ছড়িয়ে দিচ্ছে সকলের মাঝে।
 ঐ দূরে লাল-সাদায় একটি বাড়ি, বাড়ি না বলে স্থাপত্য বলা ভাল। যাইহোক একটি নাম দিতে পারলে সুবিধে হয়, তাই নাম দিলাম ম্যূলে রুজ। স্থান- ভারতবর্ষ, কাল- ২০০৫। এই শহরে যে কয়েকটি নান্দনিকতা বজায় রেখে স্থাপত্য হয়েছে, এটি তার অন্যতম। ম্যূলে রুজ-কে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বলা ভাল।
 এর ঠিক গা ঘেষে একটি কালো পিচের সুন্দর রাস্তা চলে গেছে – নাম, সার্কুলার রোড। কিছুটা এগিয়ে বাম দিক ঘেষে বড় সাদা তিন-তলা বাড়িটা – এই গল্পের পমির আবাস। বাড়িতে সর্বসাকূল্যে ছয়টি প্রাণী – বাবা, মা, দুটি চাকর, সাহানা ও তার পমি। পমি ও সাহানার যোগটিও ভারী অদ্ভূত।
  সাহানার তখন বয়স ১৫ কি ১৬, রাত্রি হয়েছে, ফিরছিল পিয়ানোর ক্লাস থেকে। বাইরের দরজা খোলার সময় একটি হলুদ-সাদায় ঝালর-ঝালর লোমশ কুকুর ঢুকে পড়ে। সেই যে ঢুকল, আর যায় নি।  সাহানা অনেক চেষ্টা করেছিল কুকুরের মালিক-কে খোঁজার, পরে নিজেই মালিক; উঁহু বন্ধু, না না সাথী হয়ে যায়।
 বিকেল প্রায় পাঁচটা। ম্যূলে রুজ-এর কালো বড় গেট দিয়ে সাহানাদের গোলাপী রঙ-এর মারুতি জেন্‌ টি এসে দাড়াল। দরজা খুলতেই প্রথমে পমি, পরে সাহানা। সাহানার আজ সবই গোলাপী ও সাদার কম্বিনেশান্‌। চুড়িদারের ওপরটি গোলাপী, তার ওপর চেপে রয়েছে কুঁচি দেওয়া সাদা এপ্রণ। টিপ সাদা, কানের চুলও সাদা। সব মিলিয়ে দুধে-আলতা রঙের নির্বাক আভিজাত্য। সত্যি কথা বলতে – সাহানার চোখ দুটির উজ্জ্বলতা সব কিছুকে ছাপিয়ে যায়।
   পমি ঢুকেই একটু লেজটা নেড়ে, চারিদিকে দেখে সোজা বাম দিকে এগোয়। ম্যূলে রুজ-এর সামনের লন্‌টাকে ক্যান্টিন আখ্যা দিলেও, আদপে ওপেন এয়ার রেস্তোঁরা।  প্রজ্ঞা ও রেহানা দুজনে বসে ছিল। পমিকে দেখে ঘুরে তাকায়। প্রজ্ঞার উঠে দাড়ানোর আগেই সাহানা এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরে। পমি চুপটি করে বসে লেজ নাড়তে থাকে। একটু অবাক হয় – সাহানা ও রেহানার গাল ঘষাঘষি দেখে। ভাবে, সকলেরই আদরের ভঙ্গি একই।
   ‘পমি’ ডাকটি শুনেই বুঝতে পারে মিসেস সাহনি্‌। ঘুরে তাকিয়ে দেখে যথারীতি হাতে সিগারেট। এই ভদ্রমহিলা বেশ ভাল। সেলফ্‌-স্টার্টার, সেলফ্‌-কন্টেড্‌ না বলে সেলফ্‌-মেড বলা ভাল। পমি একটু আনন্দের সাথেই গুটিগুটি এগোয়। এর তার পা-এর ফাঁক দিয়ে গলে যায়। মিসেস সাহনি্‌ ঝুকে গলায় হাত রাখেন। পমি পা তুলে হাত মেলায়। শেষে দুজনে এগোয় একটা কেক এর উদ্দেশ্যে।
 খানিকবাদে মিসেস সাহনি্‌ ব্যস্ত হয়ে পড়েন এক ভদ্রলোকের সাথে। এই লোকটিকে পমি কখনও দেখেনি। লম্বা, চওড়া, সাইডে সিথে। টাকও বেশ ভালই পড়েছে। পমি ভদ্রলোকের থেকে চোখ ফিরিয়ে মিসেস সাহনি্‌র দিকে তাকায় – মিসেস সাহনি্‌র চোখে খুশির ঝলক। পমি একটু অবাক হয়ে মাথাটা তোলে, দেখে – তিতিল। বসে আছে চুপটি করে। সাথে রয়েছে আরো কয়েকজন। পমি এগোয়।
তিতিল সেন্ট পল স্কুলে পড়ে, ক্লাস – ২, ভারী মিষ্টি। পাশে মা বসে আছেন – প্রতিভা। একালের সেরা ক্রিয়েটিভ ডান্সারদের একজন। ভদ্রমহিলার একফোঁটা অহঙ্কার নেই, ব্যবহারও মার্জিত। প্রতিভা পমিকে দেখে বলে – “ওমা, সাহানা এসে গেছে। কই দেখি”, বলে উঠে পড়ে। পমির ভালই হলো। তিতিলের সাথে ভাব বিনিময়টা ভালই হবে। তিতিল রাজু আঙ্কেলকে ডেকে একটা জুস দেওয়ার কথা বলে পমির জন্য।
 দেখতে দেখতে সময় হয়ে আসে। উঠে পড়ে সকলে। ওঠে তিতিল ও পমিও। মজার ব্যাপার, এখানে এসে সাহানা বা তিতিল-এর মা, কেউই তাদের সন্তান বা সাথী নিয়ে চিন্তিত থাকেন না। ওরা দুজনে এসে বসে অডিটরিয়াম-এ। তিতিল দখল করে একদম ডানদিকের একটা চেয়ার। পমি বসে ঠিক তার পাশে।
 ধীরে লাইট অফ্‌ হয়। হল নিস্তব্ধ। সকলে চুপটি করে দেখে একটি শর্ট ফিল্ম। বিষয় – পাগল। শুরু যখন হয়েছে, শেষও হয়। তারপরই আরম্ভ হয় আত্মিক বিশ্লেষণ – জ্ঞান না অ-জ্ঞান কিসের গভীরতা জাহির ঠিক বোঝা যায় না।
                                                          পমি ঘাড় ঘোরায় পিছন দিকে। কোনায় বসা পমির দীর্ঘদিনের পরিচিত ভালমানুষটি উঠে বেরিয়ে গেলেন। পমিও তার বিশ্লেষণ একটি ‘ভৌ’ এর মাধ্যমে প্রকাশ করে তিতিলকে নিয়ে বেরিয়ে আসে।                                   
কয়েকদিন পর, দুপুরবেলা ম্যূলে রুজ-এর একটি বড় ঘরে পর্দাটাকে টেনে নিশান্ত এসে বসে। চারিদিকে আলোটা একটু বেড়ে যায়। নিশান্ত চেয়ারে বসে লেখার শেষ কয়েকটি লাইন ভাল করে দেখে নেয়। The more acute the pain, the less articulate it’s expression”.  নিশান্ত-এর খেয়াল পড়ে না কোথায় পড়েছিল, তবে দীর্ঘপথ পেরিয়ে এটা বোঝে – This is ‘Silence’.
 কাছে টেনে আবার লিখতে বসে – যে কোনও সৃষ্টির অর্ন্তনিহিত শক্তি বোঝা যায় তা কত সময়ের জন্য ‘Silence’ দিয়ে যায়। বিষয়টা বড় নয়, তার মধ্যে স্থিত শক্তিটা ও তার নান্দনিক রুপে উপস্থাপনাটা বড়। নিশান্ত চেয়ারে হেলান দেয়।
 টক টক করে আওয়াজ হতে ঘোর কাটে নিশান্তের। কাম্‌ ইন্‌ শব্দে ভেতরে প্রবেশ করে এক যুবক। এসেছে লেখাটির জন্য। লেখাটি নেয় ও চলে যায়। নিশান্ত জানালার ধারে এসে দু-হাতে ভর দিয়ে ভাবে – ছিল হওয়ার কথা পরিচালক, হোল সমাচলক।
 আসলে লেখায় পমির কথা আসার কারণ নিশান্ত সিনেমাটা দেখছিল শুরু থেকে। পর্দা নয় পর্দার বাইরে থেকে, পমির চোখ দিয়ে। সাহানা নিশান্ত-এর মেয়ে, আর পমি নিশান্ত-এর স্নেহের সাথী। আসলে টাইটেলটা হওয়া উচিত ছিল ‘পমির চোখে নিশান্ত-এর দুনিয়া’।  

Popular Posts