দেখা

                                                              

ছেলেবেলার একটি স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে। তখন বয়স তেরো কি চোদ্দো। বিহারের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। চারিধার পাহাড় ও জঙ্গলে ঘেরা। সন্ধেকেও মনে হয় অনেক রাত্রি। হঠাৎ অনেক দূরে নজরে পড়ে আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। প্রথমে ভাবি আগুন লেগেছে। পরে বুঝি ওটা দাবানল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত চুপটি করে দেখি।
ঘটনাটির উল্লেখ একটি শব্দের অর্থে পৌঁছতে। এখানে শেষে তাকানোর বদলে দেখি এই শব্দটি ব্যবহার করি কারণ এতদিন পরেও তা আমার মস্তিস্কের থেকে বিশ্মরিত হয়নি। শুধু তাই নয় যতদিন যায় ততই বিভিন্ন গভীরতার থেকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ পায়। ইংরেজিতে এই “দেখা” শব্দটির বিভিন্ন প্রতিরূপ রয়েছে – look, see, perceive। আসলে গভীরতার পরিবর্ত্তন হয়েছে। প্রকৃত অর্থে perceive অর্থাৎ গ্রহণ করাটাই “দেখা”।
এবার আসি কিছু শারীরবৃত্তীয় কথায়। মানুষ তার ইন্দ্রিয়গুলি অর্থাৎ চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা, নাসিকা, ও ত্বক সমস্ত কিছু দিয়েই গ্রহণ করে। এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলির সাহায্যে সে যা কিছু গ্রহণ করে তা বিভিন্ন নার্ভ-এর দ্বারা electromagnetic impulse রুপে প্রেরণ করে মস্তিস্কের বিভিন্ন কোষে। মস্তিস্কের এই কোষগুলি যা কিছু গ্রহণ করে তার ভিত্তিতে রঙ ও আলোর মাধ্যমে একটি পরিস্কার চিত্রের সাহায্যে ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করে।
এতো গেল শরীরের কথা। একটু অন্যভাবে দেখলে পাই – এই জগৎটা অর্থে পুরোটা ভিন্ন ভিন্ন অংশ নিয়ে তৈরি। আবার উল্টোভাবে এগোলে ভিন্ন ভিন্ন অংশ জুড়ে তৈরি এই জগৎটা। এককথায় system-টি concentric। Concentric-এর বৈশিষ্ট এই যে এর একটি উৎস বর্তমান ও তাকে ঘিরে সমস্ত উপাদানের অবস্থান। শুধু তাই নয়, সমস্ত উপাদানগুলি একটিরই অর্থাৎ উৎসটিরই বৈশিষ্ট প্রকাশ করে। মজার ব্যাপার এই যে আমরা এই জগৎ-এর প্রকাশের সাথে এক হয়ে রয়েছে। তাই সর্বদা ও সর্বত্র এই জগৎ এর লয়, তাল, সুর এর বাইরে নিজেকে রেখে অনুভব করার শক্তি অর্জণ করাই শ্রেয়।
বিষয়টি কথায় প্রকাশ করা যতটা সহজ প্রকৃত রুপ দেওয়া বোধকরি ততটাই কঠিন। এই প্রসঙ্গের অবতারনা শুধু look, see, perceive এই শব্দকটির প্রকৃত প্রকাশ-এর জন্য। যে কোনোও মানুষ তার গভীরতার দ্বারা দ্যাখে। তাই শুধু নিজেকে গভীর থেকে গভীরতর ও গভীরতম করার মধ্যেই দেখার পরিবর্ত্তন ঘটে। অর্থাৎ স্থূল থেকে সুক্ষ; আরোও সুক্ষ বিষয় গ্রহণ করার ক্ষমতা আসে।
তাই প্রকৃতির অর্থাৎ জগৎ-এর সম্যক রুপ পেতে হলে whole to the part শুধু নয় part to the whole-এর মেলবন্ধন ঘটিয়ে স্থিরতার দিকে এগোতে হয়। এই বোধকরি প্রকৃত “দেখা”।

Popular Posts